‘ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে’

নাসার অ্যাপোলো-১৭ অভিযানে শেষবার চাঁদের মাটিতে পা রাখিয়াছিল মানুষ। উহা ছিল ১৯৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর। ৫০ বত্সর পর পুনরায় চাঁদে মানুষ পাঠাইবার উদ্যোগ লইয়াছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আশা করা হইতেছে, আগামী সোমবার সন্ধ্যায় চন্দ্রাভিমুখে পৃথিবীর মাটি ছাড়িবে ‘আর্টেমিস-১’। লম্বায় ৯৮ মিটার ‘আর্টেমিস-১’কে বলা হইতেছে পৃথিবীর ইতিহাসে শক্তিশালী মহাকাশযান। অবশ্য প্রথম পর্বে এই মহাকাশযানে কোনো নভশ্চর থাকিবে না। তবে সকল কিছু ঠিক থাকিলে ২০২৪ সালের মধ্যে নাসা চাঁদে মহাকাশচারী পাঠাইবে। সেইখানে থাকিবে নারী নভশ্চরও। গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী চাঁদের দেবী আর্টেমিস। তাহার নামানুসারে এই চন্দ্রযানের নাম রাখা হইয়াছে।

‘আর্টেমিস-১’ অভিযানের এইক্ষণে স্মরণ করা যাইতে পারে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম পা রাখিবার ঘটনাটি। উহার নেপথ্যে ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঠান্ডা লড়াইয়ের টানাপড়েন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই দুই পরাশক্তির মধ্যকার টক্কর ছিল সেয়ানে সেয়ানে। এই টক্করে ১৯৫৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর কক্ষপথে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুত্নিক প্রেরণ করে। ইহার পর তাহারা ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিনকে প্রথম মহাশূন্যে পাঠাইয়া বিশ্বকে তাক লাগাইয়া দেয়। এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় একটি ‘লাফ’ দেওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়াছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ঘোষণা করেন যে, অচিরেই আমেরিকা চাঁদের মাটিতে পা রাখিবে। এই জন্য ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের ৪ শতাংশের অধিক বরাদ্দ দেওয়া হয় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসাকে। ১৯৬৫ সালে সোভিয়েত যখন ‘স্পেস ওয়াক’ সম্পন্ন করে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম অ্যাপোলো-১ অভিযান মুখ থুবড়াইয়া পড়ে। লাঞ্চপ্যাডের অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যু ঘটে তিন নভোচারীর। আমরা দেখিতে পাই, মহাকাশে কর্তৃত্ব অর্জন করিতে যুক্তরাষ্ট্র ইহার পর আরো মরিয়া হইয়া উঠে। ইহার পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই অ্যাপোলো-১১ মিশনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিন নভোচারী চাঁদে পা রাখেন। যুক্তরাষ্ট্র এই অর্জনকে ঘোষণা করে সমগ্র মানবজাতির অর্জন হিসাবে। চাঁদের মাটিতে প্রথম পা ফেলিবার সময় বলা হয়—মানুষের জন্য ইহা ‘ছোট্ট পদক্ষেপ’; কিন্তু মানবসভ্যতার জন্য ইহা বিরাট লাফ।

কিন্তু মানুষ কি সত্যিই চাঁদের মাটিতে পা রাখিয়াছিল? অভিযানের অর্ধ-যুগ পরপরই ইহা লইয়া প্রশ্ন উঠে। সর্বশেষ ২০০১ ফক্স নিউজে ‘আমরা কি সত্যিই চাঁদে অবতরণ করিয়াছিলাম’ নামক একটি তথ্যচিত্র প্রচার করা হয়, যাহার পরিচালক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রহস্যসিরিজ ‘দ্য এক্স ফাইলস’-এর অভিনেতা মিচ পিলেগ্গি। ঐ প্রামাণ্যচিত্রে দাবি করা হয়, চাঁদে যাইবার ব্যাপারটি ছিল স্রেফ একটি ধাপ্পাবাজি। প্রশ্ন হইল, কেবল অ্যাপোলো নহে, মার্স, জেমিনি, অ্যাটলাসের মিশনও কি মিথ্যা? কুকুর লাইকা অথবা ইউরি গ্যাগারিনও কি সত্যিই মহাশূন্যে ভ্রমণ করিয়াছিলেন? আসলে সর্বযুগে সকল দেশেই কিছু মানুষ থাকেন, যাহারা সংশয়বাদী। সংশয়বাদী হওয়াটা দোষণীয় নহে। তবে তাহার শক্ত ভিত্তি থাকা চাই। অ্যাপোলো-১১ অভিযানের তিন জন ছাড়াও পরবর্তীকালে আরো বেশ কয়েকটি অভিযানে এখন অবধি এক ডজন মানুষ চাঁদে গিয়াছেন।

আধুনিক বিজ্ঞান বলে, আফ্রিকা হইতে সমগ্র পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িয়াছিল মানুষ। ইহার নেপথ্যে ছিল নূতন ও অজানার প্রতি তীব্র আকর্ষণ। মানুষ অদম্য কৌতূহলে তরি ভাসাইয়াছে মহাসমুদ্রে, আবিষ্কার করিয়াছে নূতন নূতন ভূখণ্ড, স্থাপন করিয়াছে নূতন উপনিবেশ। বিভিন্ন সময় কলম্বাস, ভাস্কো-দা-গামা, আমেরিগোসহ অসংখ্য অভিযাত্রী অংশ লইয়াছে এই দুঃসাহিসক অভিযানে। ইহা হইল পরাশক্তিদের নূতন উপনিবেশ অনুসন্ধানের অদম্য আকাঙ্ক্ষা। অনেকে মনে করেন, বিপুল ব্যয়ে নির্মিত ‘আর্টেমিস-১’ চন্দ্রাভিযানের নেপথ্যেও রহিয়াছে পরাশক্তির পরাক্রমশীলতা। মান্না দে যেমন গাহিয়াছিলেন—‘ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে’; কিন্তু চাঁদ কি সকল সময় তাহার জোছনাকে সামলাইয়া রাখিতে পারে? আমরা অবশ্যই চাই ‘আর্টেমিস-১’ অভিযান সফল হউক। কারণ উহা দ্বারা আহরিত জ্ঞান নিঃসন্দেহে ঋদ্ধ করিবে সমগ্র মানবজাতিকেই।