‘জঙ্গিবাদের পথে পা বাড়িয়ে তারা লাপাত্তা’

কুমিল্লা থেকে ২১ দিন ধরে সাত তরুণ মেধাবী ছাত্র ‘নিখোঁজ’। এতে নানা রহস্য ও সন্দেহ ডালপালা মেলেছে। ‘নিখোঁজ’ ছাত্রদের পরিবারের সদস্যরা তাদের সন্তানদের ফিরে পেতে দিশাহারা। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র বলেছে, তাদের বিশ্বাস জন্মেছে যে ‘ঐ ছাত্ররা জঙ্গিবাদের পথেই পা বাড়িয়েছেন। উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চেতনায় তাদের মগজ ধোলাই হয়েছে। তারা নিখোঁজ নন, স্বেচ্ছায় উগ্রবাদে জড়িয়ে লাপাত্তা হয়েছেন।’

সূত্রের দাবি, কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী মোহাম্মদ আস সামি। গত ২৩ আগস্ট ঘর ছেড়ে নিরুদ্দেশ হন। এর আগে তার বাবার উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে যান। চিঠির মাধ্যমে জঙ্গিবাদের পথে তার পা বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। চিঠির সূত্র ধরে তাদের সন্ধানে কাজ করছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট, র‍্যাব, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। 

সূত্র জানায়, ‘নিখোঁজ’ মোহাম্মদ আস সামির লেখা চিঠিটি তার বাবার কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সামি চিঠিতে উল্লেখ করেন, ‘মোরা মুসলিম চিরবীর। মরলে শহীদ বাঁচলে গাজী।’ ‘জিহাদ জিহাদ জিহাদ চাই, জিহাদ করে মরতে চাই।’ চিঠিতে সামি বলেন, ‘বাবা, স্বপ্নপূরণে বেরিয়ে পড়লাম, খুঁজে লাভ নেই। শুধু দোয়া করবেন, যেন স্বপ্নপূরণে সক্ষম হই। যেন আল্লাহ তায়ালা আমায় কবুল করেন। আপনাদের কবুল করেন। আমাকে খুঁজে লাভ নেই। যে স্বেচ্ছায় হারিয়ে যায়, তাকে পাওয়া যায় না।’ 

চিঠিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘বাবা, আপনার সাথে আমার বনিবনা হয় নাই। সব সময় গালাগালি ও মারামারিই চলেছে। কিন্তু আমার কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর রহম করুন। আমি আপনার চাহিদামতো সন্তান হতে পারি নাই। কিন্তু চেষ্টা করেছি, যেন আপনার অভিযোগ বা অসন্তুষ্টির কারণ না হই। সফল হয়েছি কি না, জানি না। আমায় ক্ষমা করবেন। কোনো অভিযোগ রাখবেন না ইনশাআল্লাহ। আম্মুর সাথে খুব বাজে ব্যবহার করেছি। আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন। আপনাদের হক নষ্ট করেছি একসময়। দয়া করে সন্তান ভেবে কোনো দাবি রাখবেন না। শুধু দোয়া করবেন, যেন স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। আজীবন ভাইয়ারও হক নষ্ট করেছি।’

ঐ চিঠিতে সামি লিখেছেন, ‘কয়েক জন স্যারের একটু বকেয়া আছে। একটু শোধ করে দিয়েন। এসব আমার অন্ধকার জীবনের গুনাহ।’ চিঠির এমন ভাষা থেকে জঙ্গিবাদের পথে পা বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।

গত ২৩ আগস্ট একসঙ্গে ‘নিখোঁজ’ সাত মেধাবী ছাত্র হলেন—ইমরান বিন রহমান ওরফে শিথিল, মোহাম্মদ আস সামি। তারা দুই জন কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের চলতি বছর এইচএসসি পরীক্ষার্থী। হাসিবুল ইসলাম ও নিহাল আবদুল্লাহ কুমিল্লা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ইমতিয়াজ আহমেদ রিফাত কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া কলেজের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের, আমিনুল ইসলাম আলামিন একই কলেজের স্নাতক (সম্মান) তৃতীয় বর্ষের ছাত্র এবং সরতাজ ইসলাম ওরফে নিলয় ঢাকা ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করা। তাদের বয়স ১৭ থেকে ২৫ বছর।

এই সাত ছাত্রের ‘নিখোঁজের’ ঘটনায় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় পাঁচটি এবং ঢাকায় একটি জিডি করা হয়েছে। ‘নিখোঁজ’ একাধিক ছাত্রের পারিবারিক সূত্র জানায়, তারা ধর্মভীরু, ধর্মকর্ম করেন। বিভিন্ন মসজিদে গিয়ে তারা তাবলিগের বয়ান শোনেন। পরিবারকে তারা মসজিদে গিয়ে তাবলিগের বয়ান শোনার কথা বলতেন। তবে দু-একজন অভিভাবকের দাবি, তাদের সন্তানেরা ধর্মভীরু হলেও জঙ্গিবাদে জড়াতে পারেন না। তারা হয়তো পরিবারকে না জানিয়ে তাবলিগে গেছেন। তাদের পরিবারের দাবি, পড়াশোনার বাইরে অন্য কোনো বিশেষ বিষয়ের প্রতি কখনো তারা সন্তানদের আগ্রহ দেখেননি। কলেজ, কোচিংয়ের বাইরে যে সময়টি পেতেন, তার বেশির ভাগটাই বাসায় বই পড়ে কিংবা মোবাইল ফোনে তারা সময় কাটাতেন।

ইমরান বিন রহমান ওরফে শিথিলের বাবা মজিবুর রহমান মুকুল বলেন, ‘ফোন বেজে উঠলে তাড়াতাড়ি রিসিভ করি। এই বুঝি আমার ছেলে ফোন করল। কই আছে আমার সন্তান, আমার মন তো আর মানে না।’ ইমতিয়াজ আহমেদ রিফাতের মা বলেন, ‘২১ দিন চলে গেল, ছেলেটা কই আছে, কেমন আছে, খাওয়া-দাওয়া করছে কি না—কিছুই জানি না। সবাই মিলে আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেন।’

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুটি সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন, একসঙ্গে তাদের নিরুদ্দেশ হওয়া বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, উগ্রবাদে জড়িয়ে ঐ সাত তরুণ কথিত হিজরতের জন্য নিজেরাই বাড়ি ছেড়েছেন। তারা নিষিদ্ধ একটি জঙ্গি সংগঠনের ‘ফাঁদে’ পা দিয়ে কথিত হিজরতের উদ্দেশ্যে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেছেন। তারা বলছেন, কুমিল্লার এই তরুণ ছাত্রদের আগে সিলেট অঞ্চল থেকেও বেশ কিছু তরুণ ঐ জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন। কুমিল্লার এই তরুণেরাও এর মধ্যে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন বলে তাদের হাতে তথ্য রয়েছে। এরই মধ্যে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের টিম নিখোঁজ সাত শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছে। এছাড়া কুমিল্লার র‍্যাব কার্যালয়ে বৈঠকে নিখোঁজদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, পিসি, ল্যাপটপ সম্পর্কিত সব ধরনের তথ্য দেন তাদের অভিভাবকেরা।

এর আগে চাঁদপুরের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন রাতে চাঁদপুর শহরের রেলস্টেশনে তিন তরুণকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেন পুলিশের এক সদস্য। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন তারা কুমিল্লার বাসা থেকে অভিমান করে চলে এসেছেন। পরে তিনি তাদের একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। পরদিন তারা বাড়ি ফেরার কথা বলে সেখান থেকে কৌশলে সবাইকে বোকা বানিয়ে পালিয়ে যান। চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মিলন মাহমুদ বলেন, ‘এদিন পুলিশের কাছে নিখোঁজ তরুণদের ব্যাপারে কোনো তথ্য ছিল না। পুলিশ বিশ্বাস করেছিল, তারা সত্যি সত্যি অভিমান করে ঘর ছেড়েছেন।’

র‍্যাব-১১, সিপিসি-২ কুমিল্লার অধিনায়ক মেজর মোহাম্মদ সাকিব হোসেন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে খুব তৎপর রয়েছি। এ ব্যাপারে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।’ কুমিল্লার পুলিশ সুপার আবদুল মান্নান সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিখোঁজদের উদ্ধার এবং ঘটনার তদন্তে মাঠে কাজ করছে ঢাকা ও কুমিল্লার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক টিম।