নিজের উপর বিশ্বাস রাখিলে আলো আসিবেই

অনেকের মতে, আধুনিক জীবনের দর্শন হইল—স্ট্রেস বা মানসিক চাপ আমাদের কর্মের চালিকাশক্তি, উহা কখনো প্রতিবন্ধকতা নহে । এই জন্য আধুনিক জীবন অনেকটা প্রেশার কুকারের মতো—যাহাতে অল্প খরচে ও স্বল্প সময়ে কার্য হাসিল করা যায়। তবে সেই প্রেশার কখনো-সখনো ভয়ংকর বিপদও ডাকিয়া আনে। একটি জরিপকারী প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি দাবি করিয়াছে যে, বাংলাদেশে কোভিড মহামারি-পরবর্তী সময়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের ৭৫ শতাংশের বেশি মানসিক সমস্যায় ভুগিতেছেন । আত্মহত্যার পথও বাছিয়া লইতেছেন অনেকে।

কোভিড সুনামির উত্তাল তরঙ্গ শেষ হইতে না হইতেই রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধ যেন প্রতিদিন অস্থিরতার নূতন ইতিহাস রচনা করিয়া চলিতেছে এই বিশ্বে। সেই সুনামি আর অস্থিরতায় বিশ্বের সকল দেশেরই সকল শ্রেণির মানুষের মধ্যেই অল্পবিস্তর মানসিক সমস্যা দেখা দিয়াছে । বাংলাদেশও উহার বাহিরে নহে। তরুণরা যেহেতু স্বপ্নের কারিগর হয়, তাহাদের সম্মুখে পড়িয়া থাকে দীর্ঘ জীবন এবং সেই কারণে জীবনের নিয়মে তাহাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও অধিক থাকে। এই জন্য জরিপে দেখা গিয়াছে, আত্মহত্যার চিন্তাভাবনা মাথায় আসিয়াছে প্রায় ৩৪ শতাংশ তরুণ শিক্ষার্থীর । তাহারা অতিরিক্ত ভয় ও উদ্বেগে জর্জরিত। পাশাপাশি দৈনন্দিন আচার-আচরণ ও ব্যবহারে পরিবর্তনও আসিয়াছে শিক্ষার্থীদের জীবনে। ৮০ শতাংশের কাছাকাছি শিক্ষার্থীরা জানাইয়াছেন, তাহাদের মন খারাপ হওয়া, হঠাৎ ক্লান্তিসহ নানা জটিলতা বাড়িয়াছে। অনেকেই মনে করিতেছেন পরিবার হইতে তৈরি হওয়া ‘অযাচিত' চাপে তাহারা অতিষ্ঠ ও পিষ্ট। অন্যদিকে, তিন-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থীই চাকুরিক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার লইয়া দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এই অনিশ্চয়তার কারণেও মানসিক চাপ বাড়িতেছে তাহাদের।

জগতে বিভিন্ন সময়ে এই ধরনের সংকটাপন্ন অবস্থা তৈরি হইয়াছে। এমনকি বিখ্যাত মনীষীরাও জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রবল মানসিক চাপে পিষ্ট হইয়াছেন। এই অবস্থায় সবচাইতে জরুরি বিষয় হইল—সর্বপ্রথম নিজেকে জানা। প্রকৃত আত্ম-উপলব্ধি থাকিলে প্রবল মানসিক চাপের একটি 'সেফটি ভালব' তৈরি হইয়া যায়, প্রেশার কুকারের মতো। তাহাতে ভয়ংকর বিপদ হইতে বাঁচা যায় । উদ্বেগের ক্ষেত্রে উইনস্টন চার্চিল বলিয়াছেন, 'যখন আমি আমার সমস্ত উদ্বেগের দিকে ফিরিয়া তাকাই, তখন আমার সেই বৃদ্ধের গল্পটি মনে পড়ে যে তাহার মৃত্যুশয্যায় বলিয়াছিলেন যে—তাহার জীবন দুশ্চিন্তাজনিত কষ্টে জর্জরিত ছিল, যেই সকল দুশ্চিন্তার প্রায় কোনোটাই কখনো ঘটে নাই।' খলিল জিবরান মনে করিতেন, 'আমাদের উদ্বেগ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করিয়া আসে না, বরং আসে ইহাকে নিয়ন্ত্রণ করিবার প্রচেষ্টা হিসাবে। এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ উক্তিটি করিয়াছে হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে কে রাউলিং। তিনি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন, "কোনো কিছুতে ব্যর্থ না হইয়া বাঁচিয়া থাকা অসম্ভব।'

সুতরাং ব্যর্থতা জীবনেরই অপরিহার্য অংশ। তরুণ বয়সে পড়াশুনার চাপ, পরীক্ষার চাপ, সামাজিকতা, ব্যক্তিগত হতাশার মতো বিষয়ও একটি শিক্ষার্থী নূতন অভিজ্ঞতা দান করে । ইহারও মূল্য রহিয়াছে। কিন্তু আত্মহত্যা কখনো সমাধান হইতে পারে না। যখন মনে হয়, টানেলের শেষ প্রান্তেও কোনো আলো নাই—তখন অবশ্যই জানিতে হইবে যে, ইহা শতভাগ বিভ্রান্তিমূলক ভাবনা । কারণ, আমরা কখনোই আমাদের 'ভবিষ্যৎ' জানি না। আমরা যাহা যেইভাবে ভাবি, কখনই তাহা সেইভাবে হয় না। অতীতেও হয় নাই, ভবিষ্যতেও হয় নাই। সুতরাং টানেলের শেষ প্রান্তেও অবশ্যই আলো রহিয়াছে। শুধু প্রশ্নটা হইল, টানেলটা কতখানি লম্বা এবং আপনি সেই লম্বা টানেল পাড়ি দিতে ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছেন কি না, কিংবা ভয় পাইতেছেন কি না। এই ক্ষেত্রে সবচাইতে সহজ ভাবনা হইল—টানেলের পথ লইয়া ভাবিয়া দেখিবার দরকার নাই, কখনো না কখনো আলো তো আসিয়া পড়িবেই—এই বিশ্বাস রাখিয়া আগাইয়া যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হইয়া বুদ্ধিমানের কাজ না করিয়া হতাশ হওয়া কিংবা আত্মহত্যা করা সবচাইতে বড় নির্বুদ্ধিতা। অতএব, নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন, আলো আসিবেই। জয় আপনার সুনিশ্চিত।