ক্যাবিনেট কালেকটিভ রেসপনসিবিলিটি বা মন্ত্রিপরিষদের যৌথ দায়িত্বের বিষয়টি পার্লামেন্টারি সিস্টেম বা সংসদীয় ব্যবস্থায় একটি সাংবিধানিক কনভেনশন বা প্রথা-রীতি হিসাবে বিবেচিত। ইনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটেনিকার মতে, ইহাকে মিনিস্টিরিয়াল রেসপনসিবিলিটি হিসাবেও আখ্যায়িত করা হয়। এই রীতিনীতির কারণে মন্ত্রিসভার সদস্যদের অবশ্যই মন্ত্রিসভায় নেওয়া সমস্ত সরকারি সিদ্ধান্তকে প্রকাশ্যে সমর্থন করিতে হইবে। এমনকি যদি তাহারা ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিষয়ে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের সহিত একমত পোষণ নাও করেন, তবু তাহার বিরোধিতা করা সংগত হইবে না। ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থায় ইহা একটি মৌলিক সাংবিধানিক নীতি। এই নীতি অনুযায়ী মন্ত্রীরা তাহাদের মন্ত্রণালয় ও সরকার পরিচালনার জন্য সামগ্রিকভাবে সংসদের নিকট দায়বদ্ধ এবং সংসদ দায়বদ্ধ জনগণের নিকট। এই কারণে মন্ত্রীদের অবশ্যই সরকারি নীতি সমর্থন করিতে হইবে। সমর্থন না করিলে তাহাদের পদত্যাগ ছাড়া কোনো উপায় থাকিবে না। একইভাবে কোনো সরকার সংসদে অনাস্থার সম্মুখীন হইলে সেই সরকার ভাঙিয়া দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এই কারণে ক্যাবিনেট বা মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে সংহতি খুবই দরকার। একই কারণে কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কাহাকেও এককভাবে দায়ী করিবার অবকাশ নাই। এককভাবে দায়ী করিলে ক্যাবিনেট কালেকটিভ রেসপনসিবিলিটি আর থাকে না।
বিতর্কিত আর্থিক নীতির কারণে বাজারে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে টিকিয়া থাকিতে শেষ পর্যন্ত নিজের অর্থমন্ত্রী কোয়াসি কোয়ার্টেংকে বরখাস্ত করিয়াছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। নূতন অর্থমন্ত্রী হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হইয়াছে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেরেমি হান্টকে। মাত্র ৩৭ দিন পূর্বে ক্ষমতায় আসিয়াছেন লিজ ট্রাস। ইহারই মধ্যে যেইভাবে তাহার অর্থমন্ত্রীকে বিদায় নিতে হইল, তাহা লইয়া সমালোচনা উঠিয়াছে বিশ্বে। বাজারে অস্থিরতার জন্য যখন কোয়ার্টেংয়ের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করা হয়, তখন তিনি স্পষ্টত ব্যর্থতার দায় নিতে অস্বীকার করেন। কারণ তিনি যে আর্থিক নীতি বা মিনি বাজেট পেশ করেন, তাহা তাহার একক কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। ইহা ক্যাবিনেটের যৌথ সিদ্ধান্ত ছিল। সুতরাং তিনি এককভাবে ইহার দায় নিবেন কেন? ক্যাবিনেট রেসপনসিবিলিটির দৃষ্টিভঙ্গি হইতে তাহার বক্তব্য সঠিক ছিল। ক্যাবিনেটের যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করপোরেশন কর ১৯ শতাংশ হইতে বাড়াইয়া ২৫ শতাংশে উন্নীত না করিবার নীতি গ্রহণ করা হয়; কিন্তু অর্থমন্ত্রী যখন ওয়াশিংটনে আইএমএফের সহিত বৈঠক করিতেছিলেন, তখনই তাহাকে বরখাস্ত করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট ভুল-ত্রুটির জন্য নহে, বরং তাহার এইভাবে চাকুরি হারানোটা মন্ত্রিপরিষদের যৌথ দায়িত্বের বিষয়টিকে কোনো না কোনোভাবে ক্ষুণ্ন করিয়াছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধেই কোয়ার্টেং পদত্যাগ করিয়াছেন; কিন্তু এখানে এত তাড়াহুড়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশে সফররত ছিলেন। এই সকল কারণে প্রশ্ন উঠিয়াছে, প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস আর কত দিন ক্ষমতায় থাকিতে পারিবেন?
কনজারভেটিভ এমপি স্যার জন রেডউডের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল রিজার্ভের সুদহার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করিবার কারণে তাহার ধাক্কা যুক্তরাজ্যসহ সমস্ত ইউরোপের দেশগুলিতে আসিয়া লাগিয়াছে। ইহাতে ব্রিটিশ বন্ড মার্কেটে পতন শুরু হয়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা ছাড়া কিছু ছিল না। ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করিয়া পৃথিবী জুড়িয়া যেখানে অস্থিরতা চলিতেছে এবং বিশ্বমন্দার আভাস পাওয়া যাইতেছে, সেখানে যুক্তরাজ্য কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নহে। বিশ্বখাদ্য কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর ৪৫টি দেশে এখন দুর্ভিক্ষ কড়া নাড়িতেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়, জাপানের ভূমিকম্প, ব্রিটেনসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে প্রবল খরায় অর্থনৈতিক অবস্থা এমনিতেই নাজুক। বর্তমানে তাই উন্নত-অনুন্নত সকল দেশেই অর্থমন্ত্রীরা অত্যন্ত চাপের মুখে রহিয়াছেন; কিন্তু আমাদের বক্তব্য হইল, যদি ক্যাবিনেট কালেকটিভ রেসপনসিবিলিটির বিষয়টি মানিয়া চলে, তাহা হইলে এমন টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতির সময়ে বেচারা অর্থমন্ত্রীর প্রতি কেন খড়গহস্ত হইতে হইবে? এই চাপের মধ্যে তো বিশ্বের কোনো দেশের কোনো অর্থমন্ত্রীই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করিতে পারিবেন না। বিষয়টি সকলকে আজ গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে হইবে।