ইউক্রেনের চার অঞ্চলে সামরিক আইন জারি রাশিয়ার

ইউক্রেনে দখল করা চার অঞ্চলে সামরিক আইন জারি করেছে রাশিয়া। গতকাল বুধবার এ সংক্রান্ত একটি ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অঞ্চল চারটি হচ্ছে—লুহানস্ক, দোনেত্স্ক, জাপোরিঝিয়া এবং খেরসন। ইউক্রেনের সরকার জানিয়েছে, সামরিক আইন জারি করায় কোনো কিছুরই পরিবর্তন হবে না। এদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ার নতুন কমান্ডার স্বীকার করেছেন যে খেরসনে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বেসামরিক নাগরিকদের খেরসন ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এরপর হাজার হাজার বাসিন্দা অঞ্চলটি ছাড়তে শুরু করেছে।

সামরিক আইন জারি :প্রেসিডেন্ট পুতিন গতকাল টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, রাশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং চার অঞ্চলের আমাদের নাগরিকদের জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি। পুতিন ঐসব অঞ্চলে প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিসুস্তিনের নেতৃত্বে একটি স্পেশাল কোঅর্ডিনেশন কাউন্সিল গঠন করার পরামর্শ দিয়েছেন। ইউক্রেন প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মিখাইলো পোডোলিয়াক সামরিক আইন জারির প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাশিয়া ফেডারেশন ইউক্রেনের সম্পদ লুট করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে চার অঞ্চলের কোনো কিছুতেই পরিবর্তন আসবে না। আমরা আমাদের অঞ্চল পুনর্দখল করতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাব। 

  • ‘খেরসনের পরিস্থিতি কঠিন’

ইউক্রেনে রুশ সেনাবাহিনীর কমান্ডার স্বীকার করেছেন, খেরসনে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের শহর ছেড়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাত্কারে জেনারেল সের্গেই সুরুভিকিন বলেছেন, ইউক্রেনের সৈন্যদের ছোড়া হিমার্স রকেট শহরের অবকাঠামো আর বাড়িঘরে আঘাত করছে। তিনি বলেছেন, ‘খেরসনের বাসিন্দাদের নিরাপদে শহর ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে সব রকম সহায়তা করবে রাশিয়ার সেনা সদস্যরা।’

জেনারেল সুরুভিকিন বলেছেন, ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের পুরো এলাকা জুড়েই উত্তেজনা রয়েছে।’ তার এই বক্তব্য ইউক্রেনে হামলা চালানো রাশিয়ার সৈন্যদের সংকটে থাকার বিরল এক স্বীকারোক্তি। এর আগে স্থানীয় শীর্ষ একজন কর্মকর্তাও এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। রুশসমর্থিত আঞ্চলিক কর্মকর্তা কিরিল স্তেরেমোসভ এর আগে খেরসনের বাসিন্দাদের সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, খুব তাড়াতাড়ি ইউক্রেনের সৈন্যরা খেরসনে হামলা চালানো শুরু করবে। তিনি বলেন, আমার কথা গুরুত্ব দিয়ে শুনুন—আমি পরামর্শ দিচ্ছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শহর ছেড়ে চলে যান।’ তিনি বলেছিলেন, দানিয়েপার নদীর পশ্চিম তীরে যারা রয়েছেন, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইউক্রেনে হামলা শুরু পর খেরসন শহরটি প্রথম দখল করেছিল রাশিয়া।

  • খেরসন ছাড়ছেন হাজার হাজার মানুষ

খেরসন নিয়ন্ত্রণকারী রুশ-সমর্থিত প্রশাসন ঐ শহর থেকে সরে যেতে শুরু করেছেন। তারা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন সেখানকার রুশপন্থি বেসামরিক মানুষদের। খেরসন পুনর্দখলের লক্ষ্য নিয়ে ইউক্রেনীয় সৈন্যরা ঐ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এর পরই রুশ পক্ষের প্রশাসনকে সরিয়ে নেওয়ার আদেশ জারি করা হয়। খেরসনের রুশপন্থি প্রশাসক ভ্লাদিমির সাল্ডো বলেছেন, দনিপার নদীর পশ্চিম তীরের এই শহরের ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষকে সুশৃঙ্খলভাবে ও ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রুশ টিভির খবরে দেখা যায়, লোকজন দনিপার নদীর কূলে জড়ো হচ্ছেন এবং নৌকায় ওঠার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এদের সংখ্যা কত হতে পারে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। এবছরের শুরুতে রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করেছিল তখন প্রথম যে শহরের পতন হয় সেটি ছিল খেরসন। এখন একে ইউক্রেনের বাহিনীর জন্য কৌশলগত লক্ষ্যের একটি প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। তবে এই শহরের প্রশাসনিক প্রধান জোর দিয়ে বলেছেন, তারা হটে গেলেও রুশ সৈন্যরা পেছনে থেকে যাবে এবং একে রক্ষার জন্য আমৃত্যু লড়াই করবে।

  • ইরানের ড্রোন সরবরাহ নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন : যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বিস্ফোরণের ক্ষমতাবাহী ইরানের ড্রোন রাশিয়ার কাছে সরবরাহ করার মানে হচ্ছে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার লঙ্ঘন। ফরাসি ও ব্রিটিশ মিত্রদের সঙ্গে বিশ্লেষণের পর যুক্তরাষ্ট্র একমত হয়েছে, ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তার লঙ্ঘন। ইরানের পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ঐ নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, বেশ কিছু সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা ভিদান্ত প্যাটেল বলেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে যারা ব্যবসা করবেন, তাদের যদি ইউএভি অথবা ব্যালাস্টিক মিসাইল কর্মসূচির সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা থাকে, অথবা ইরান থেকে রাশিয়ায় অস্ত্র সরবরাহে কোনোরকম সংযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তাদের খুব সতর্ক হওয়া উচিত এবং বুঝেশুনে কাজ করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে দ্বিধা করবে না।’

রাশিয়াকে ড্রোনসহ অস্ত্র সরবরাহ করার প্রমাণ পাওয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা দেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেলের মুখপাত্র নাবিলা মাসরালি বলেন, ইইউ এখন নিজস্ব উদ্যোগে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে। প্রমাণ পাওয়ার পর ইরানের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে।

ইরানের আট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেবে ইইউ। এদিকে ইরান বলেছে, রাশিয়াকে তারা ড্রোন দেয়নি। তারা এ নিয়ে ইউক্রেনসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বলেছেন, তার দেশে রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলায় ইরানের তৈরি ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়টি ক্রেমলিনের সামরিক ও রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রতীক। —বিবিসি