ঐক্য ব্যতীত প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নহে

একজন সুনাগরিক রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ। আর সুনাগরিকদের উল্লেখযোগ্য বড় গুণ হইল ঐক্য থাকা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বলা হইয়া থাকে, বুদ্ধি ব্যতীত ঐক্য হয় না, আর সুনাগরিকের প্রধান গুণ হইতেছে বুদ্ধি। কারণ বুদ্ধিমান নাগরিকই বুঝিতে পারে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান কীভাবে করা সম্ভব। এই জন্য বুদ্ধিমান ও সুশিক্ষিত নাগরিক ব্যতীত উন্নত রাষ্ট্র গঠন করা যায় না। সুনাগরিক হইতে হইলে তিনটি গুণের সমাহার থাকিতে হয়। এই তিনটি গুণ হইতেছে—বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম। সুতরাং আমাদের অবশ্যই বুদ্ধিমান, বিবেকসম্পন্ন ও আত্মসংযমী হইতে হইবে।

আমাদের অব্যাহত প্রচেষ্টা থাকিতে হইবে কীভাবে দেশ ও জাতির উন্নতিসাধন করা যায়। প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্যের সকলটুকু দিয়া দেশের ও দশের মঙ্গলসাধন করিতে হইবে। যেই দেশের নাগরিক যত সভ্য ও সুশীল, সেই দেশ তত উন্নত ও অগ্রসর। কারণ নাগরিকের দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগই দেশকে আগাইয়া লইয়া যায়। অন্যদিকে নাগরিকের দায়িত্বহীনতা ও অনগ্রসরতা যে কোনো দেশকে পিছাইয়া দেয়। সচেতন ও বলিষ্ঠ না হইলে দেশ ও জাতির জন্য কিছু করা যায় না; বরং এমন নাগরিক দেশের জন্য বোঝা। যে কোনো জাতির পরিচয় নির্ণীত হয় তাহাদের আচার-আচরণে। মনে রাখিতে হইবে, দেশপ্রেম কথায় নহে, আচরণে ফুটাইয়া তুলিতে হয়। কাহারো ভিতরে দেশপ্রেম থাকিলে তাহা ঐ ব্যক্তির আচরণেই ফুটিয়া উঠে। আমাদের দেশ স্বাধীন হইয়াছে অর্ধশত বত্সর পূর্বে। আমরা আরো অধিক আগাইয়া যাইব, যদি আমরা এক থাকি। আমরা এক থাকিতে পারিলেই শোষণ-বঞ্চনা হইতে মানুষকে রক্ষা করা সম্ভব হইবে। তিন-চার দশক পূর্বে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাইবার প্রধান উপায় ছিল জলপথ। উহা প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। কিন্তু গত ৫০ বত্সরে সারা দেশে অসংখ্য রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট তৈরি হইয়াছে। এমনকি মাকড়শার জালের মতো বিছানো নদনদীর শাখাপ্রশাখায় পরিপূর্ণ দক্ষিণাঞ্চলে, যেইখানে রাস্তাঘাট পুল-কালভার্ট করিবার সুযোগ ছিল না,  গত তিন যুগে সেই সকল অঞ্চলেও রাস্তাঘাট হইয়াছে, বড় বড় সেতু করা গিয়াছে। এখন সড়কপথে গাড়িতে চড়িয়া উপজেলা হইতে জেলায়, জেলা হইতে বিভাগে, রাজধানীতে দ্রুততম সময় যাওয়া-আসা করা যায়।

সুতরাং নাগরিকগণ যেমন রাষ্ট্রপ্রদত্ত অধিকার ভোগ করে, তেমনি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের কর্তব্যও রহিয়াছে। বস্তুত যেই দেশের নাগরিক যেইরূপ, সেই দেশটি সেইরূপেই গড়িয়া উঠে। অতএব আমাদের প্রত্যেককেই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। কাজে ফাঁকি দিলে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া হইবে। অসততা ও চালাকির আশ্রয় লইলে সেই ফাঁদে নিজেকেই পড়িতে হইবে। স্ব-স্ব কর্তব্য ও দায়িত্ব পালন করিবার মাধ্যমে এবং নিজেদের মধ্যে ঐক্যসাধন করিয়া দেশকে আগাইয়া লইতে হইবে। সুসভ্য, সুস্থ ও উন্নত সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা সৃষ্টি মূলত নাগরিকের সচেতন কর্তব্যবোধের উপরই নির্ভরশীল। মনে রাখিতে হইবে, উন্নয়নকাজে যেই সম্পদ ব্যবহূত হয়, তাহা সরকার, রাষ্ট্র তথা জনগণের সম্পদ। এই সম্পদের সদ্ব্যবহার তথা অপচয় রোধ করিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকিতে হইবে। সকল ধরনের দুর্নীতি, অপচয়, আত্মসাতের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে প্রতিরোধ গড়ার মানসিকতা সৃষ্টি করিতে হইবে। আর এই সকল কাজ সঠিকভাবে করিতে আমাদের ইমান মজবুত করা প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশ ও উন্নত দেশের মধ্যে যেই পার্থক্য তাহা আমাদের উপলব্ধি করিতে হইবে। উন্নয়নশীল দেশে জনগণকেই দায়িত্ব লইতে হয়। সুতরাং এই দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করিতে হইলে জনগণকে অবশ্যই সচেতন থাকিতে হইবে, ঐক্যবদ্ধ হইতে হইবে। নিজেকে প্রশ্ন করিতে হইবে, উন্নত দেশ গঠনের জন্য আমরা কি সুনাগরিক হইতে পারিয়াছি? আমরা কি সচেতন? আমরা কি ঐক্যবদ্ধ?