রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শহিদ হবিবুর রহমান হলের তৃতীয় তলার বারান্দা থেকে পড়ে নিহত বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী গোলাম মোস্তাকিম শাহরিয়ারের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যা এ নিয়ে চলছে আলোচনা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জি এম শাহরিয়ার ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। তিনি হল ও বিভাগীয় টিমে ফুটবল খেলতেন। এ কারণে হলে তার পরিচিতি ছিল। থাকতেন শহিদ হবিবুর রহমান হলের তৃতীয় ব্লকের তৃতীয় তলার পূর্ব পাশের সিঁড়িসংলগ্ন ৩৫৪ নম্বর কক্ষে। কিন্তু তার মৃত্যু হয়েছে হলের তৃতীয় তলার একেবারে পশ্চিম পাশের সিঁড়ির কাছের বারান্দার নিচে। তিনি যেখান দিয়ে হলের মসজিদের দ্বিতীয় তলার ছাদে (তৃতীয় তলায়) যেতে গিয়ে নিচে পড়ে মারা গেছেন, বলা হচ্ছে সেখান দিয়ে সহজে কারো যাতায়াত সম্ভব নয়। কারণ মসজিদের ছাদ ও হলের তৃতীয় তলার বারান্দার অংশটি গ্রিল দিয়ে আটকানো। মসজিদের দ্বিতীয় তলার ছাদে (তৃতীয় তলা) কি কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছিল? তাকে কি কেউ রুম থেকে মোবাইলে ডেকে নিয়েছিল?—এসব প্রশ্ন তার সহপাঠীদের।
এদিকে ঘটনার পরদিন (বৃহস্পতিবার) সকালে শাহরিয়ারের রুমে গিয়ে দেখা যায়, বিছানা ও টেবিল অগোছালো। তার টেবিলে একটি খালি ব্যাগের ওপর পলিথিনের ব্যাগে কয়েকটি পেয়ারা। পাশেই ছিল শাহরিয়ারের মানিব্যাগ। কিন্তু রুমে তার মোবাইল ছিল না বলে জানান রুমমেটরা। এগুলো দেখে যে কারো মনে হতে পারে, রুমে ফেরার পর তাকে কেউ ডেকে নিয়েছিল। পূর্ব পাশের সিঁড়িসংলগ্ন রুম ছেড়ে পশ্চিম পাশের সিঁড়িসংলগ্ন কার্নিশ বেয়ে মসজিদের দ্বিতীয় তলার ছাদে (তৃতীয় তলা) যাওয়ার কথিত চেষ্টাকে আপাতদৃষ্টিতে অবিশ্বাস্য মনে হতেই পারে। এই বিষয়ে প্রভাবমুক্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তার সহপাঠীরা।
শাহরিয়ারের খুব কাছের বন্ধু মেহেদি হাসান দাবি করেন, এটা কোনো আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা নয়। তিনি বলেন, ‘একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর হঠাত্ আশ্চর্যজনকভাবে হলের বারান্দা থেকে পড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক মৃত্যুর কাতারে পড়ে না।’ এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান তিনি। তবে শাহরিয়ারের আরেক বন্ধু মিজানুর রহমানের ধারণা, এটি দুর্ঘটনা। তিনি বলেন, ‘শাহরিয়ার আত্মহত্যা করার মতো ছেলে নয়। তবে সে মাঝেমধ্যে হলে বারান্দা থেকে ছাদের দিকে পার হতো। কখনো আবার রেলিংয়ে বসে থাকত। সেদিক বিবেচনায় ঘটনাটি দুর্ঘটনাও হতে পারে।’ ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী এম হাসান হিমেল বলেন, শাহরিয়ার যখন পড়ে, তখন তার কাছে কোনো মোবাইল ফোন ছিল না, ঘটনাস্থলেও সেটি পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ডা. শামীম ইয়াজদানি বলেন, হাসপাতালে পৌঁছার আগেই শাহরিয়ারের মৃত্যু হয়েছিল। কিভাবে তিনি মারা যান তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কারণ ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম সাব্বির সাত্তার বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে এটি একটি আকস্মিক দুর্ঘটনা। তবে ঘটনা সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশও বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। তদন্ত হওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। রাবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকায় কীভাবে সে নিচে পড়ে গিয়েছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমাদের কাছে এমন কোনো আলামত আসেনি, যা দেখে আমরা বলব যে এটা পরিকল্পিত হত্যা। প্রসঙ্গত, গত ১৯ অক্টোবর রাতে রাবির শহিদ হবিবুর রহমান হলের তৃতীয় তলার কার্নিশ থেকে নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন শিক্ষার্থী জি এম শাহরিয়ার। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলা রেকর্ড হয়নি: ইন্টার্ন চিকিত্সকদের যোগদান
এদিকে রামেক হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনায় নগরীর রাজপাড়া থানায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাখিলকৃত এজাহারটি শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ। অন্য দিকে রামেক হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিত্সকেরা বৃহস্পতিবারের ঘোষণামতো শুক্রবার ভোরে কাজে যোগ দিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. শামীম ইয়াজদানী।