চলমান প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও দেশে নানা অপ্রীতিকর-অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সংবাদ প্রকাশ পাইতেছে। দেখা যাইতেছে, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়াও সংঘর্ষে জড়াইয়া পড়িতেছে বিভিন্ন পক্ষ। সম্প্রতি অভিযোগ উঠিয়াছে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী হলের বারান্দা হইতে পড়িয়া আহত হইবার পর তাহাকে হাসপাতালে নেওয়া হইলে চিকিত্সকদের অবহেলাজনিত কারণে তাহার মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিত্সকদের দাবি, হাসপাতালে আনিবার পূর্বেই আহত ঐ শিক্ষার্থী মারা যান; কিন্তু তাহার পরও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হাসপাতালে ভাঙচুর, হামলা চালাইয়াছে। এইরূপ পালটাপালটি অভিযোগ-দাবি সহিংসতার রূপ পরিগ্রহ করিয়া পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত-অস্থির করিয়া তোলে। সত্যিকার অর্থে, দেশের চিকিত্সাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে এই ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা প্রায়ই শ্রুতিগোচর হইয়া থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণীয় ব্যাপার হইল, বাদানুবাদে জড়াইয়া পড়া উভয় পক্ষই শিক্ষিত সমাজের ব্যক্তিবর্গ; অর্থাত্ তাহাদিগকে সচেতন বলিয়াই ধরিয়া লওয়া যায়। তাহাদের মধ্যে সংযম পরিলক্ষিত হয় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ-পালটা অভিযোগকে কেন্দ্র করিয়া সংঘর্ষ, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটাইয়া ফেলেন।
সত্যিকার অর্থেই এই সমস্যার শিকড় বেশ গভীরে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিবার পর কর্তৃপক্ষ যেই তদন্ত কমিটি গঠন করিয়া থাকেন, তাহার উপর আস্থা ও বিশ্বাস রাখিতে পারেন না ভুক্তভোগী বা বিচারপ্রার্থীরা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির গৃহীত ব্যবস্থাকে আইওয়াশ হিসাবে আখ্যায়িত করিতেও দেখা যায়। অর্থাত্, কমিটির উপর আস্থা না থাকা কিংবা কমিটির সুপারিশ বা বিচারের ভবিতব্য সম্পর্কে পূর্বানুমান থাকিবার কারণেই তত্ক্ষণাত্ আইন, বিচার হাতে তুলিয়া লওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। আমরা দেখিয়া আসিতেছি, চিকিত্সাসেবা গ্রহণ করিতে আসিয়াই শুধু নহে, সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনার মতো বিষয়গুলিতেও সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্ন উঠিবার পর সংক্ষুব্ধ পক্ষকে শান্ত করিতে যেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়া থাকে, তাহা লইয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বির্তকের অবকাশ রহিয়া যায়। ইহার মূল কারণ হইল, ‘সিস্টেমের দুর্বলতা’। বস্তুত, দুর্বল সিস্টেমের হাত ধরিয়া যেই পদক্ষেপ গ্রহণের অবতারণা হইয়া থাকে তাহা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় শক্তিশালী না হইবার কারণে উপযুক্ত বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা কঠিন হইয়া পড়ে। উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিস্টেমকে ভুলভাবে প্রয়োগ করা হয়। এই বাস্তবতা যেহেতু কাহারো অজানা নহে, কাজেই কর্তৃপক্ষ বরাবর নালিশ জানাইবার আগ্রহ হারাইয়া আইন হাতে তুলিয়া লইবার ঘটনা ঘটে। কাজেই বলিতে হয়, সিস্টেমকে শক্তিশালী করিবার কথা ভাবিতে হইবে সর্বাগ্রে। নালিশ, অভিযোগ আসিবার পর যদি উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করিতে পারা না যায়, তা হইলে সন্দেহাতীতভাবে সিস্টেমের গগোল সারাইবার দরকার রহিয়াছে। সিস্টেমের গতানুগতিকতার ধারা বাদ দিয়া এমন ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে হইবে, যাহাকে জনগণ আস্থায় রাখিতে সাহস পায়, দুর্ঘটনা ঘটিবার পর নূতন করিয়া সমস্যার জটলা না পাকাইয়া কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হইয়া সমাধান, নিষ্কৃতি পাইতে ভরসা পায়।
সত্যি বলিতে, সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করিবার আমরা যে-ই অনীহার সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিয়াছি, তাহা আমাদের দারুণ ভোগাইতেছে। এই বিষয়টি লইয়া গুরুত্বসহকারে ভাবিতে হইবে। অন্যদিকে আমাদের মধ্যে সহনশীলতার মাত্রাও যেন দিন দিন কমিয়া যাইতেছে! এবং একই সঙ্গে উল্লেখ করিবার মতো বিষয় হইল, আমরা আজও ‘দায়’ লওয়ার মানসিকতা গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। সুতরাং, প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াইতে মাথা ঠান্ডা রাখিবার পাশাপাশি সকল পক্ষকে ধৈর্যশীল আচরণ করিতে হইবে। এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতে কর্তৃপক্ষকে বিচারের সংস্কৃতি গড়িয়া তুলিবার স্বার্থে কার্যকর সিস্টেম গড়িয়া তুলিতে হইবে, যাহাতে অপরাধ করিয়া কোনো পক্ষই শাস্তি এড়াইতে না পারে। সর্বোপরি, নূতন করিয়া আর কোনো দায়িত্বে অবহেলাজনিত মৃত্যু কিংবা তাহা হইতে ভাঙচুর-সংঘর্ষের মতো অনভিপ্রেত ঘটনার সাক্ষী হইতে চাহি না আমরা।