সংকট মোকাবিলায় কৃষিপ্রযুক্তি

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় কৃষির নির্ভরশীলতা আদিম যুগ থেকে অত্যাধুনিক যুগেও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও কৃষি জমির অনুপাত আগের তুলনায় অনেকটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। খাদ্য ঘাটতি পূরণে এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ অনুপাতের বিপরীতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া গতি নেই। বিশ্ব ক্রমশই মাথা নত করছে প্রযুক্তির কাছে। সেখানে পুরোনো সব রীতির বলয়ে আবদ্ধ থাকলে ক্ষতি শুধু আমাদেরই। তাই অতিসত্বর কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে খাদ্য ও পুষ্টিতে নিরাপত্তার লক্ষ্যে আমাদের পরিশ্রম করে যাওয়াই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।

২০১৬ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও সূচকসমূহের অন্যতম প্রধান একটি সূচক হলো, ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান অর্জন এবং টেকসই কৃষির প্রসার। ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের অপুষ্টির অবসান ও কৃষিজ উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে লক্ষ্যমাত্রার সন্নিকটে পৌঁছানো এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য। লক্ষ্যগুলো অর্জনে বাংলাদেশ সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে অন্যতম পদক্ষেপ ‘কৃষি ভর্তুকি’। কৃষি ভর্তুকি দিয়ে সরকার বিশ্বের উন্নত ও দামি সব প্রযুক্তি কৃষকের উন্নয়নে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা ইতিমধ্যে ফসল চাষকালীন সময়ে দৃশ্যমান। এর মধ্যে অন্যতম হলো, কম্বাইন্ড হারভেস্টার; যেটি ব্যবহারের ফলে ফসল সংগ্রহোত্তর লোকসান প্রায় ১০ শতাংশ হারে কমে যায়। এছাড়া কম সময়ে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদিত ফসলের ক্ষতি হ্রাস, ফসলের গুণমান রক্ষা এবং কেন্দ্রীয় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে গুণমানসম্পন্ন ফসল নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষি প্রযুক্তির আশীর্বাদে ইতিমধ্যে আমাদের দেশে দ্বি-ফসলি জমিতে ত্রি-ফসলি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট জমিতে হাইব্রিড জাতের বীজ ব্যবহারের ফলে আগের তুলনায় ফসল উৎপাদন বেড়েছে। পোকামাকড় দমনে সার্বক্ষণিক কীটনাশকের ওপরে নির্ভরশীলতা কমাতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সহায়তায় পোকা, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও নেমাটোডের বিপরীতে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছে বিভিন্ন জাতের ফসল। বাংলাদেশের অনিশ্চিত আবহাওয়া বিবেচনায় এনে খরা সহিষ্ণু, লবণাক্ততা সহিষ্ণু, বন্যা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা আমাদের দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা মেটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। এছাড়া কৃষির বহুমাত্রিক প্রযুক্তি যেমন- আন্তঃফসল চাষাবাদ, রিলে ফসল, মিশ্র ফসল, ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, রেটুন ফসল, কৃষি বনায়ন, আধুনিক চাষাবাদ প্রক্রিয়ায় চর এলাকাসহ সব পতিত জমিতে চাষের আওতায় আনা, ছাদ কৃষির সম্প্রসারণ, জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত চারা ও ফল উৎপাদন ইত্যাদি কাজে লাগিয়ে দেশের খাদ্য ঘাটতি মেটানো সম্ভব। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত অনেকগুলো কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন— হাইস্পিড রোটারি টিলার, বেড প্লানটার, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, স্বচালিত শস্য কর্তন যন্ত্র, শক্তি চালিত শস্য মাড়াই যন্ত্র ইত্যাদি কৃষকের সেবা দিয়ে যাচ্ছে। 

বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা শোচনীয় হওয়ায় প্রধান খাদ্য তথা ভাত কেন্দ্রিকতা অপুষ্টির একটি প্রধান কারণ। যেখানে ভাত শুধুই কার্বোহাইড্রেটের ঘাটতি পূরণে সক্ষম। যদিও খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ কিছু নতুন জাতের ধান উদ্ভাবিত হয়েছে, কিন্তু তা এখনো গ্রামীণ সমাজ ও কৃষকবর্গ সনাতন জনপ্রিয় জাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। এমনকি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই কৃষিপণ্যের গুণমান আগের মতো বজায় থাকে না বিধায় সাময়িক সময়ের জন্য পাকস্থলির ক্ষুধা মিটলেও, দেহের গাঠনিক বস্তু ক্ষুধার্তই থেকে যায়। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ শুধু উদর ক্ষুধা নিবারণের নিমিত্তে ভুলে যায় দেহের শক্তি ও পর্যাপ্ত পুষ্টির  প্রয়োজন। এছাড়া আমাদের দেশে অপর্যাপ্ত খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার কারণে অফ-সিজনে কৃষিপণ্যের যোগান হ্রাস পেয়ে খাদ্যপণ্যের মূল্য অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় তা জনসাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাই সরকারি গুদামের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সারা বছর খাদ্যপণ্য সরবরাহ করে ক্রয়ক্ষমতার আওতায় আনলে দেশের সর্বত্র ও সর্বসাধারণের কাছে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ঘোষিত আসন্ন  মন্দা মোকাবিলা করা সম্ভব। 

লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।