পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। এই কথা জানা থাকিলেও আমরা আমাদের ঘরবাড়ি, প্রতিবেশী ও পাড়া-মহল্লার পরিবেশ রক্ষায় এখনো সচেতনতার পরিচয় দিতে পারিতেছি না। আমরা যদি মনে করি, আমরা নিজেরা নোংরা থাকিব এবং কেহ আসিয়া আমাদের পরিচ্ছন্ন করিয়া তুলিবে, তাহা হইলে ভুল হইবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ সুন্দর রাখিতে স্থানীয় সরকারের ভূমিকা নিঃসন্দেহে রহিয়াছে; কিন্তু কেবল তাহাদের উপর নির্ভর করিয়া বসিয়া থাকিলে চলিবে না। বিভিন্ন অসুখবিসুখ সৃষ্টির পিছনে রহিয়াছে পরিবেশের অপরিচ্ছন্নতা ও দূষণ। নিজেদের ঘরবাড়িসহ আশপাশের পরিবেশ যাহাতে দূষিত বা রোগ-বালাইয়ের ভাগাড় না হয়, এই জন্য আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল হইতে হইবে।
দেশে বর্তমানে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ দেখা দিয়াছে। গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবরে বলা হইয়াছে যে, ডেঙ্গুতে সমগ্র দেশে পাঁচ জনের মৃত্যু হইয়াছে এবং ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হইয়াছে আরো ৯০৩ জন রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কনট্রোল রুমের সাম্প্রতিক ডেঙ্গুবিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, এই রোগ ক্রমেই বিপজ্জনক হইয়া উঠিতেছে। বর্তমানে সমগ্র দেশে ৩ হাজার ৪৮২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হইয়াছে। তাহার মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ২ হাজার ২৯০ জন এবং ঢাকার বাহিরে ১ হাজার ১৯২ জন। চলতি বৎসরের পহেলা জানুয়ারি হইতে গত ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হইয়াছে ৩১ হাজার ৯৬৬ জন এবং এই বৎসর এই পর্যন্ত মারা গিয়াছে ১১৮ জন। পরিস্থিতি সামাল দিতে করোনা শয্যাগুলি ডেঙ্গু রোগের শয্যায় রূপান্তর করা হইয়াছে কোথাও কোথাও। উপর্যুক্ত হিসাব হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর ভিত্তিতে করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরো অধিক, যাহাদের অনেকে ঘরে বসিয়া চিকিৎসা গ্রহণ করিতেছে। এই ডেঙ্গু রোগের পিছনেও পরিবেশ দূষণের সম্পর্ক রহিয়াছে নিবিড়ভাবে। বিশেষ করিয়া ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তবে এই পানি কয়েক দিনের পুরাতন। এই জন্য কোনো পাত্রে জমিয়া থাকা পানি অবশ্যই তিন দিনের মধ্যে পরিবর্তন করিতে হইবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ করিতে হইলে অফিস বা বাসাবাড়িতে রাখা ফুলের টব, এসি ও ফ্রিজে জমিয়া থাকা পানির ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করিতে হইবে। আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখিতে পাড়া-প্রতিবেশীকে লইয়া কিছুদিন পরপরই পরিচালনা করিতে হইবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান। কেননা এডিস মশা চারিপাশে পড়িয়া থাকা পাত্র যেমন—পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা, চিপসের খালি প্যাকেট, পরিত্যক্ত ফুড কনটেইনার ইত্যাদিতে জমিয়া থাকা পানিতে বাসা বাঁধিতে পারে। নির্মাণাধীন ভবনের মধ্যে, চৌবাচ্চায়, লিফটের গর্তে, ওয়াটার মিটারের গর্তে ও স্থাপনাগুলোর যেইখানে যেইখানে পানি জমিয়া থাকিবার আশঙ্কা রহিয়াছে, সেইখানে সেইখানে ডেঙ্গুর প্রজনন বাড়িয়া যাইতে পারে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া হইতে বাঁচিয়া থাকিতে হইলে এডিস মশার এই প্রজননস্থলগুলি পূর্বে ধ্বংস করিতে হইবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন প্রভৃতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এখন বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে লওয়া। এডিশ মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থলগুলি ধ্বংসে ঔষধ স্প্রে করা। জনগণকে সচেতন করিয়া তুলিতে বিভিন্নভাবে প্রচার-প্রচারণা চালানো। ইউনিয়ন ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিরও এখন তৎপর থাকা প্রয়োজন। সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলি এই সময় জনসচেতনতায় পালন করিতে পারে সক্রিয় ভূমিকা। জ্বর থাকিলে কোভিড-১৯ টেস্টের পাশাপাশি ডেঙ্গু জ্বরের পরীক্ষা তথা এনএসআই টেস্ট করা আবশ্যক। এই উভয় টেস্ট সহজলভ্য করিতে হইবে সর্বত্র। দিনে ও রাত্রিতে ঘুমানো বা বিশ্রাম গ্রহণের সময় মশারি ব্যবহার করিতে হইবে। তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, চোখ ও মাংসপেশি ও পেটে ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলেই অবহেলা করা যাইবে না। নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাইতে হইবে বা নিতে হইবে চিকিৎসকের পরামর্শ।