শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির অনিয়ম

আমাদের স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি যখন নানা দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়াইয়া পড়ে, তখন জাতির ভবিষ্যত্ লইয়া আমরা চিন্তিত না হইয়া পারি না। কেননা এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হইতে তাহা হইলে শিক্ষার্থীরা কী শিখিবে? তবে এই অনিয়ম শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাসা বাঁধিয়াছে বলিলে ভুল হইবে; আমাদের গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাই আজ দুর্নীতিগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। প্রবাদে বলা হয়, সারা শরীরে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা? এই ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি একান্ত প্রযোজ্য।

ইত্তেফাকের একটি খবরে বলা হইয়াছে যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি আইনের কোনো তোয়াক্কা করিতেছে না। সারা দেশে অন্তত ৫ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটির বিরুদ্ধে রহিয়াছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ। অভিযোগগুলি অত্যন্ত গুরুতর। যেমন—শিক্ষকদের অন্যায়ভাবে চাকুরিচ্যুতি, অবৈধ নিয়োগ বা নিয়োগ বাণিজ্য, প্রতিষ্ঠানের তহবিল তছরুপ, ঘুষ গ্রহণ ইত্যাদি। কিন্তু এই সকল প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক বডি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই সকল অভিযোগের কোনো সুরাহা করিতে পারিতেছে না। তাহাদের এই সকল বিষয় সমাধানের ইচ্ছা নাই, তাহা নহে। কিন্তু তাহারা অনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করেন বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। এই কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাহারা পালন করেন নীরব দর্শকের ভূমিকা। এই সকল অনিয়ম ও অভিযোগ তদন্ত করিতে গিয়া তাহারা উলটা ক্ষতির মুখে পড়েন। আমাদের দেশে আটটি সাধারণ, একটি মাদ্রাসা ও একটি কারিগরি শিক্ষা বোর্ড রহিয়াছে। স্কুল ও উচ্চমাধ্যমিক কলেজগুলোর ম্যানেজিং কমিটি-গভর্নিং বডির অনুমোদন তাহারাই দিয়া থাকেন। কমিটিগুলি তদারকির দায়িত্বও তাহাদের। ইহা ছাড়া ডিগ্রি স্তরের কলেজগুলির গভর্নিং বডির অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্ব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। দেশে এমন স্কুল-কলেজের সংখ্যা ৩০ হাজারেরও অধিক। এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে কোনো গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ পাইলে তাহারা সেই সকল কমিটি বাতিল করিয়া দেওয়ার এক্তিয়ার রাখেন। কিন্তু তাহারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহাদের সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেন না বলিয়া শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগী ব্যক্তিরা আদালতের শরণাপন্ন হন।

উপর্যুক্ত সমস্যা হইতে আমাদের পরিত্রাণের উপায় কী? গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে যাহাদের বসানো হইতেছে তাহারা রাগ-অনুরাগ ও ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠিয়া কাজ করিতে না পারিলে আখেরে আমাদের কপালে যে দুঃখ আছে, তাহা আর বলিবার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন, দুর্নীতি ও অনিয়ম কোথায় নাই তাহা বলাই এখন কঠিন। কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নহে, সরকারি যে কোনো প্রতিষ্ঠানে চলে নিয়োগবাণিজ্য। চাকুরি পাইতে ঘুষের রেট এখন ওপেন সিক্রেট বিষয়। যাহারা সমস্ত দেশটাকে হূদয়ঙ্গম করিতে পারেন, তাহারা জানেন, আমরা কতটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় রহিয়াছি। রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ইত্যাদি অনেক ক্ষেত্রে নির্মাণ না করিয়াই বিল উঠাইয়া নেওয়া হইতেছে। কাজ ফেলিয়া রাখিয়া দায়িত্বহীনের মতো উধাও হইয়া যাইতেছে ঠিকাদার। সাব-কন্টাকটররা নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি আশ্রয় নিতেছে। কিন্তু কাহারও কোনো কেশাগ্র স্পর্শ করা যাইতেছে না। যদি অনিয়ম কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হইত, তাহলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা মিলিয়া বিপ্লব করিয়া ফেলিত এবং ইহার একটি সমাধানে পৌঁছাইত। কিন্তু অনিয়ম যখন সবখানে, তখন অসহায়ত্ব প্রকাশ ছাড়া আর কীই-বা করিবার রহিয়াছে! কোন মন্ত্রণালয় ও কোন বিভাগে দুর্নীতির ছড়াছড়ি নাই? একমাত্র সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীতে এখনো নিয়োগবাণিজ্য তেমন একটা বা তুলনামূলকভাবে নাই। সেইখানে তদবির করিতে গেলে হিতে বিপরীত হয়, তাহার আর চাকুরি হয় না।

আমরা এই দম বন্ধ করা পরিবেশ হইতে পরিত্রাণ চাই। উন্নয়নশীল দেশের সরকার প্রধান এই দুঃসহ সময়ে কীভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করিতেছেন, তাহাই চিন্তা ও গবেষণার বিষয়। তাহার পরও নিয়মকানুন রক্ষায় কাহাকে না কাহাকে মেরুদণ্ড সোজা করিয়া দাঁড়াইতে হইবে। স্কুল-কলেজ পরিচালনা কমিটি সম্পর্কে যেই সকল আইন ও বিধিমালা রহিয়াছে প্রয়োজনে তাহার সংশোধন করা যায়। সভাপতি বা সদস্য পদে কোনো ব্যক্তি পরপর দুইবার থাকিতে পারিবেন না, ইহা একটি স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম। এই ক্ষেত্রে তাহা কেন প্রযোজ্য হইবে না? এই ধরনের কমিটিতে আসিবার ক্ষেত্রে যথাসম্ভব শিক্ষিত ও বিদ্যোত্সাহী লোকদেরই উত্সাহিত করা প্রয়োজন। বিধিমালা প্রণয়নে এই বিষয়টির প্রতিও আমাদের লক্ষ রাখিতে হইবে।