আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে প্রশ্ন, রাজস্ব আয় কমবে, কর্মসংস্থান হারাবেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা 

তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রস্তাবিত কিছু সংশোধনী নিয়ে আপত্তি উঠেছে। বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বলছেন, আইনটি সংশোধের খসড়ায় এমন কিছু প্রস্তাব আনা হয়েছে, যা কার্যকর হলে নিশ্চিতভাবে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে। অন্যদিকে কর্মসংস্থান হারাবেন লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও ভাসমান বিক্রেতা। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন সংশোধনী প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার কমানো হলেও প্রকৃতপক্ষে কিছু প্রস্তাব কার্যকর হলে এর ব্যবহার না কমে অসাধু ও অবৈধ তামাক ব্যবসায়ীদের আরো উত্সাহিত করবে। 

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অধীন জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল গত ১৬ জুন ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (২০১৩ সালে সংশোধিত)-এর অধিকতর সংশোধনের খসড়া প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। এরপর ১৯ জুন এ ব্যাপারে জনগণ ও অংশীদারদের মতামত চেয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, তামাক ও তামাকজাতীয় পণ্যের ব্যবহার কমাতে প্রস্তাবিত সংশোধনীর খসড়ায় এমন কিছু ধারা সংযুক্ত করা হয়েছে, যা এর মূল উদ্দেশ্য পূরণ না করে এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় বহুলাংশে কমিয়ে দেবে। অন্যদিকে প্রায় ১৩ থেকে ১৫ লাখ ক্ষুদ্র ও ভাসমান ব্যবসায়ীর কর্মসংস্থানে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গত দুই বছর কোভিডের ধাক্কায় অনানুষ্ঠানিক খাতের অনেক শ্রমজীবী মানুষের আয় অনেকাংশে কমে গেছে। অনেকেই দীর্ঘদিন ব্যবসা বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছিল। করোনা সংক্রমণ কমে আসায় তারা আবার যখন ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চেষ্টা করছে, তখন এমন বাস্তবতা বিবর্জিত সংশোধনী কার্যকর হলে তারা আবার মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হবে। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা ও সংগঠন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা তামাকের ব্যবহার কমাতে সরকারের উদ্দেশ্যের সঙ্গে একমত। কিন্তু অর্থনীতির এই কঠিন সময়ে রাজস্ব আয় এবং কর্মসংস্থানের বিনিময়ে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে নয় তারা। এর পরিবর্তে সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন প্রচারণা হাতে নেওয়া উচিত বলে অনেকেই মনে করেন। 

সংশোধিত আইনের খসড়ায় মোবাইল বা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের সিগারেট বা তামাকজাতীয় পণ্য বিক্রি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। খুচরা শলাকা বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাবনা দেওয়া  হয়েছে, অর্থাৎ দোকানিকে পুরো প্যাকেট সিগারেট বিক্রি করতে হবে। সিগারেট বিক্রেতাদের স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণের পাশাপাশি বিক্রয়কেন্দ্রে সিগারেটের প্রদর্শন নিষিদ্ধ করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া চায়ের দোকানকে পাবলিক প্লেস বা উন্মুক্ত স্থান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে সেখানে ধূমপান নিষিদ্ধ করার সুপারিশও রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব প্রস্তাব বাস্তবসম্মত নয় এবং এর ফলে মূল উদ্দেশ্য অর্জিত না হয়ে বরং দেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। কারণ এই মুহূর্তে রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় খাতে এমন বিপর্যয় ডেকে আনার অর্থ রাজস্বে বিপুল আঘাত এবং অর্থনীতিতে তার প্রভাব হবে মারাত্মক। 

মতামত জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ধারা অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক। আইনগতভাবে পরিচালিত একটি শিল্পকে ক্ষতির মুখে না ফেলে সরকারের উচিত তামাক ব্যবহারের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির দিকে মনোযোগ দেওয়া। খসড়া সংশোধনীতে যেসব প্রস্তাব করা হয়েছে, তা সিগারেটের ব্যবহার কমাতে কার্যকর হবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এর ফলে নিশ্চিতভাবেই রাজস্ব আয় কমবে। 

সম্প্রতি জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতির (নাসিব) এক বৈঠকে তামাকজাত পণ্যের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স গ্রহণের প্রস্তাবে তীব্র আপত্তি জানানো হয়েছে। বৈঠকে জানানো হয়, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের প্রস্তাবিত কিছু সংশোধনী কার্যকর হলে এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত প্রায় ১৫ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ী মারাত্মক সংকটে পড়বে। যার সঙ্গে নিম্ন আয়ের পরিবারের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষের জীবিকার প্রশ্ন জড়িত। 

এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তামাক খাত এনবিআরের ভ্যাট আদায়ের সবচেয়ে বড় উৎস। গত অর্থবছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট এসেছে এ খাত থেকে। তামাক খাতকেন্দ্রিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজস্ব আয়ের বিবেচনা থাকা উচিত। কর আদায়ে হঠাৎ ধস নামতে পারে এবং কর্মসংস্থানে আঘাত হানতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ এই মুহূর্তে নেওয়া উচিত হবে না। 

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের কিছু প্রস্তাব কার্যকর হলে দোকান মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। সংশোধিত আইনটি পাশ করার আগে এসব প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তার মতে, খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতাদের স্থানীয় সরকারের কাছ থেকে পৃথক লাইসেন্স গ্রহণ এবং ভাসমান বিক্রি নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বহু নিম্ন আয়ের মানুষের জীবিকার ওপর সরাসরি আঘাত হানবে। তিনি ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। লাইসেন্স গ্রহণের শর্ত শুধু উৎপাদকদের ক্ষেত্রে থাকা উচিত বলে মনে করেন দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের এই সাবেক সহসভাপতি। 

রাজধানীর পল্টন এলাকার হকার মোহাম্মদ সেলিম জানেন না যে, তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধন প্রস্তাবে ভ্রাম্যমাণ সিগারেট বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাকে এ প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত করে মতামত জানতে চাইলে বলেন, আপাতত তার আর কোনো পেশায় যাওয়ার সুযোগ নেই। ফেরি করে সিগারেট বিক্রি বন্ধ হয়ে গেলে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে তার পথে বসা ছাড়া আর উপায় থাকবে না। 

ফকিরাপুল এলাকার ক্ষুদ্র দোকানদার মো. জসিম উদ্দিন জানান, পুরো এক প্যাকেট সিগারেট কেনেন খুবই কম ক্রেতা। বেশির ভাগ ক্রেতা এক থেকে  শলাকা সিগারেট কিনে থাকেন। আলাদা করে শলাকা বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে তার বিক্রি কমে যাবে অন্তত ৯০ শতাংশ। এতে তার আয় ও জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। 

লেখক : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক