নির্মাণ শেষ দুই মাস আগে

তবু চালু হচ্ছে না সিলেটের নতুন বাস টার্মিনাল

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মিউনিসিপ্যাল গভর্নমেন্ট সার্ভিস প্রজেক্ট (এমজিএসপি) প্রকল্পের আওতায় সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিকের) উদ্যোগে ৬৩ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দে দক্ষিণ সুরমায় সিলেট কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প শেষ হয়েছে দুই মাস আগেই। কিন্তু এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হচ্ছে না বলে চালুও হচ্ছে না। অন্যদিকে টার্মিনালটি চালু হতে বিলম্ব হওয়ায় দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাসগুলোর ঠাঁই হয়েছে টার্মিনালসংলগ্ন সড়কের ওপর। গত চার বছর থেকেই এই বাসগুলো সড়কের ওপর থেকেই যাওয়া-আসা করছে। ফলে সিলেট রেল স্টেশনের গেটের মুখ থেকে দুই পাশ জুড়ে অন্তত অর্ধ কিলোমিটার তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতকারীরা তীব্র যানজটের কবলে পড়ে। প্রায় সময় যাত্রীরা লাগেজপত্র নিয়ে মুশকিলে পড়েন। অনেক সময় ট্রেন ও বাসের টিকিট গচ্চা যায়। যাত্রীরা বলেন, টার্মিনালটি হয় দ্রুত উদ্বোধন করা হোক, নয় তো বাসগুলো সরিয়ে এলাকাটি যানজটমুক্ত রাখা হোক।

দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত সিলেটের এই কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। সিসিক বলেছে, এটি বাংলাদেশের অনন্য একটি বাস টার্মিনাল। টার্মিনালটি বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে ঘটা করে উদ্বোধন করতে চায় সিসিক। কিন্তু উদ্বোধনের দিনক্ষণ ঠিক হচ্ছে না বলে বিলম্ব হচ্ছে এটি চালু করতে। দক্ষিণ সুরমার কদমতলীতে টার্মিনালের আট একর ভূমির ওপর কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। ২০২০ সালে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। পরে ২০২২-এর জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। তাও শেষ হয়নি। সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, ‘জুনেই বাস টার্মিনালের কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, আশা করছি শিগিগরই এটি উদ্বোধন করা হবে।

সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘চালু হওয়ার পর এ টার্মিনালই হবে দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ও আধুনিক সুবিধাসংবলিত বাস টার্মিনাল। তিনি বলেন, টার্মিনালটি চালু হওয়ার পর এলাকার চেহারা পালটে যাবে।’

কারুকার্যময় লাল ইটের দেওয়াল, ইট রঙের স্টিলের ছাউনি, গাছপালা আবৃত গ্রিন জোন, বিমানবন্দরের আদলে আলাদা প্রবেশ ও বহির্গমন পথ, যাত্রীদের জন্য প্রায় দেড় হাজার আসনের বিশাল ওয়েটিং লাউঞ্জ রয়েছে এখানে। ছয়তলা ভিত্তির তিনতলা কমপ্লেক্স প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডালি কনস্ট্রাকশন। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আসাম টাইপ বাড়ি আর আলী আমজদের ঘড়ির স্থাপনার সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয় ঘটিয়ে নির্মিত হয়েছে এ বাস টার্মিনাল। নগরের কদমতলী এলাকায় পুরোনো বাস টার্মিনালের স্থানেই আট একর জায়গা জুড়ে এই টার্মিনাল।

পুরো টার্মিনালের প্রথম অংশের বহির্গমন ভবনের দৈর্ঘ্য ৩৫০ ফুট। এই অংশে ৪৮টি বাস একসঙ্গে থাকতে পারবে। এ ছাড়া যাত্রীদের বসার জন্য রয়েছে ৯৭০ আসনের বিশাল হল। রয়েছে ৩০ আসনের ভিআইপি কক্ষ, ৩০টি টিকিট কাউন্টার ও নামাজের জন্য আলাদা কক্ষ। পুরুষ, নারী ও বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন লোকের ব্যবহার উপযোগী ছয়টি টয়লেটও থাকবে এখানে।  হুইল চেয়ার  ব্যবহার করা যাবে। রয়েছে লিফট, রেস্টুরেন্ট ও ফুড কোর্ট। অসুস্থ হয়ে যাওয়া যাত্রীর জন্য আলাদা শয্যা ও ব্রেস্ট ফিডিং জোন থাকবে এখানে।

দ্বিতীয় অংশের আগমনি ভবন প্রায় ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্যের। এখানে রয়েছে যাত্রীদের বসার জন্য ৫১০ আসনের বসার স্থান ও ৩০ আসনের ভিআইপি কক্ষ, আধুনিক টয়লেট সুবিধা, ব্রেস্ট ফিডিং জোন, লিফট, রেস্টুরেন্টসহ অন্যান্য সুবিধা। পশ্চিম-দক্ষিণ কর্নারে সড়কের সঙ্গে গোলাকার পাঁচতলা টাওয়ার বিল্ডিংয়ে রয়েছে টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা অফিস। যেখানে থাকবে পুরো টার্মিনালের সিকিউরিটি কন্ট্রোল ও সিসিটিভি মনিটরিং কক্ষ, পুলিশ কক্ষ এবং পর্যটন অফিস।

টার্মিনালের পেছনের দিকে তৃতীয় অংশে নির্মিত হয়েছে একটি মাল্টিপারপাস ওয়েলফেয়ার সেন্টার। যেখানে মালিক ও চালক সমিতির জন্য থাকবে ২৪ বেডের বিশ্রাম কক্ষ, গোসলের ব্যবস্থা, অফিস, লকার ব্যবস্থা, ক্যান্টিন এবং মিটিং ও অনুষ্ঠানের জন্য মাল্টিপারপাস মিলনায়তন। পরিবহন শ্রমিকদের জন্য মাল্টিপারপাস বিল্ডিংয়ে থাকবে।  এ প্রকল্পের স্টিলের টিন থাইওয়ান থেকে আনা হয়। এখানে বিমানবন্দরের মতো বিশাল ওয়েটিং স্পেস রাখা হয়েছে। আছে পার্কিং জোন ও গাছপালা আচ্ছাদিত গ্রিনজোন। সব মিলিয়ে এটি হবে দেশের অন্যতম সুন্দর একটি স্থাপনা।

নতুন এই টার্মিনালের নকশা করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের তিন শিক্ষক সুব্রত দাশ, রবিন দে এবং মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। বাস টার্মিনালের নকশায় সিলেটের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটানো হয়েছে। সিলেটের ঐতিহ্য আসাম টাইপ বাড়ি, চাঁদনীঘাটের ঘড়ির আদলে এর নকশা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।