আমাদের এই উপমহাদেশটি পৃথিবীর যে কোনো অঞ্চল হইতে একেবারেই আলাদা ও স্বতন্ত্র। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যয়নে নানা কারণে এই উপমহাদেশ লইয়া তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কারণ এই উপমহাদেশের দেশগুলিতে আইনকানুন ও নিয়মশৃঙ্খলার চর্চা তুলনামূলকভাবে কম। প্রতিবেশী একটি বৃহত্ দেশের রাজধানীতে আজ বড় বড় ও সুন্দর সুন্দর রাস্তা নির্মাণ করা হইয়াছে; কিন্তু খোদ রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় চলাচলের জন্য সাইন-সিম্বল ও মার্কিং নাই। পশ্চিমা দেশগুলিতে ইহা কল্পনাও করা যায় না। নিয়ম না মানিয়া গাড়ি চালাইলে নির্ঘাত মামলার কোপানলে পড়িতে হইবে। ট্রাফিক সিগন্যাল না মানিয়া রাস্তা পারাপার করাটাও বিপজ্জনক। জরিমানা গুনিতে গুনিতে ফতুর হইয়া যাইবার জোগাড় হইবে। অথচ এই উপমহাদেশের দেশগুলিতে যেন নিয়মকানুনের বালাই নাই। নিয়ম না মানাটাই এখানে নিয়ম এবং আইন ভঙ্গ করাটাই যেন আইন হইয়া দাঁড়াইয়াছে। বাংলাদেশের কোথাও তেমন ট্রাফিক সিগন্যাল নাই। ঢাকায় বহু টাকা ব্যয় করিয়া আধুনিক সিগন্যাল বাতির ব্যবস্থা করা হইয়াছিল; কিন্তু এখন তাহা অকার্যকর। ম্যানুয়াল পদ্ধতিই এখন ভরসা।
আমরা আসলে নিজস্ব গতি, শক্তি ও মেজাজে চলিতেছি। এই জন্য এখানে বলিতে গেলে ‘গণতন্ত্র’ও অকার্যকর। নিয়মকানুন না মানিলে আর যাহাই হউক তাহা দ্বারা গণতন্ত্র কায়েম করা যায় না। গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণে যে কোনো নাগরিকের রহিয়াছে ব্যক্তি স্বাধীনতা; কিন্তু সেই অধিকার অন্যের নাকের ডগা পর্যন্ত। কেহ নিজের অধিকার রক্ষা করিতে গিয়া অন্যের অধিকার ব্যাহত করিতে পারেন না। রাস্তাঘাটে আমরা যখন তখন ময়লা-আবর্জনা ফেলি, যাহা মোটেও কাম্য নহে। এই সমস্ত দেশের যাহারা আইনপ্রণেতা, তাহাদেরও অনেক সময় দেখা যায় আইনের ব্যত্যয় ঘটাইতে। আমরা অনেক সময় অন্যের অধিকার লইয়া ছিনিমিনি খেলি। সবচাইতে লজ্জাজনক বিষয় হইল, আমরা অন্যদের এমন উপদেশ প্রদান করি, যাহা আমরা নিজেরাই পালন করি না। রাস্তা আটকাইয়া সমাবেশ করা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করা অনাকাঙ্ক্ষিত; কিন্তু কোথাও কোথাও অনেকটা স্থায়ীভাবে রাস্তা বন্ধ করিয়া দেওয়া হইলেও সেদিকে আমাদের ভ্রুক্ষেপ নাই। বড় বড় সমাবেশ করিবার অনেক মাঠই আজ বেদখল হইয়া গিয়াছে। কী বিচিত্র দেশ! নাগরিক অধিকার আছে বলিয়া অনেক সময় চিন্তাও করা যায় না। শুধু বাঙালি হইলে কথা ছিল, সমস্ত উপমহাদেশেই আজ একই অবস্থা বিরাজমান! আধাসামন্তবাদী সমাজব্যবস্থা হইতে আমরা এখনো বাহির হইয়া আসিতে না পারায় দুঃখজনকভাবে নাগরিক অধিকার আজ পদে পদে ভূলুণ্ঠিত হইতেছে।
এদিকে পৃথিবীও আজ খণ্ডবিখণ্ড। বহু মেরুকরণ হইতে বিশ্বব্যবস্থা কোন দিকে মোড় নেয় তাহা আমাদের এখনো অজানা। তবে গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের একটা করিয়া ভোট প্রদানের অধিকার স্বীকৃত। কেহ কোনো কারণে ভোট দিতে না পারিলে একজন ভোটার রিটার্নিং অফিসারের নিকট অভিযোগ দিলে তাহা আমলে নিতে বাধ্য; কিন্তু নাগরিকদের সেই অধিকার সচেতনতা লইয়া প্রশ্ন রহিয়াছে এই সকল দেশে। কেননা তাহারা অনেক সময় ১০ কেজি চাউল, এক লিটার সয়াবিন তৈল, একটা টিউবওয়েল, এক কাপ চা ইত্যাদি পাইয়াই অনেক সময় বিক্রয় হইয়া যান। এই সমস্ত দেশে দাতা দেশগুলির কর্মকর্তাদের দেখানো ও খুশি করিবার জন্য রাজধানীকেন্দ্রিক নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয় এবং রাজধানীকে তিলোত্তমা শহরে পরিণত করিতে যাহা করা দরকার তাহা করা হয়। অথচ একেকটি ঝরনা বা সৌন্দর্যবর্ধক প্রকল্প কাটছাঁট করিয়া তাহা একটি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যয় করা হইলে তাহা দিয়া একাধিক রাস্তাঘাট নির্মাণ করা সম্ভব। রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নের জন্য গ্রাম-গঞ্জের মানুষ আজ রাজধানী শহরে আসিতে বাধ্য হইতেছে। ইহাতে দারিদ্র্য নিসরণ হইতেছে না, আবার রাজধানী বসবাসের অযোগ্য ও অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হইয়া পড়িতেছে। অথচ দাতা দেশগুলির ঋণ আমরা ঠিকই সুদে-আসলে পরিশোধ করিয়া থাকি। অতএব, এই অপরিকল্পনা ও বিশৃঙ্খলা হইতে আমাদের বাহির হইয়া আসিতে হইবে। নাগরিক অধিকার রক্ষায় গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনাকে ধারণ করিতে হইবে সর্বান্তকরণে।