যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ জন হেনরি ক্লার্ক বলিয়াছিলেন, ‘ইতিহাস সবকিছু নহে, কিন্তু ইতিহাস শুরুর কথা মনে করাইয়া দেয়। ইহা একটি ঘড়ির মতো, জনগণকে তাহাদের রাজনীতি ও সংস্কৃতির নানা কথা মনে করাইয়া দেয়। ইহা মানব সম্প্রদায়ের ভুগোলের উপর মানচিত্র আঁকিয়া তাহাদের অবস্থা ও অবস্থান চিত্রিত করে। ইহা মানুষকে শুধু অবস্থানের কথাই বলে না, ইহা কোথায় যাইতে হইবে সেই পথও নির্দেশ করিয়া দেয়।’ দুঃখের বিষয়, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে, অথবা রাজনৈতিক জীবনে এই সত্যের গুরুত্ব অনুধাবন করিতে পারি নাই। যদি পারিতাম তাহা হইলে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, পরিবেশ হয়তো ভিন্ন রকম হইত।
পৃথিবীর ইতিহাসের পাতায় পাতায় রহিয়াছে ষড়যন্ত্র, বিশেষ করিয়া প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ঠিকুজি। যাহারা এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করিয়াছেন, যাহারা বিশাল আত্মবিশ্বাসী সম্রাট বা সুলতানকে পরাজয়ের অথবা পতনের তিক্ততা পাইতে ঠেলিয়া দিয়াছেন তাহাদের সকলেরই ছিল কেমোফ্লেজড বা ছদ্মবেশী রূপ। অন্য দিকে সেই সকল শাসক নির্বিঘ্নে, স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে, নিরাপদে শাসন করিতে পারিয়াছেন যাহারা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রকে অঙ্কুরে বিনাশ করিতে পারিয়াছেন। জ্ঞানীজনে বলিয়া থাকেন, শাসনকার্যের বড় শত্রু আবেগ ও ভুল মানুষ নির্ধারণের প্রবণতা।
উপরিউক্ত কথাগুলি বলিবার কারণ বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক আবহ। দেশের বড় দুই দলের মধ্যে ঢুকিয়া পড়িয়াছে রাজাকার, আলবদর, আলশামস তথা স্বাধীনতাবিরোধী এবং তাহাদের উত্তরসূরিরা। শুধু ঢুকিয়া পড়ে নাই, দিনে দিনে উচ্চ শিখরে উন্নীত হইতেছে। যেহেতু তাহারা এই দেশেরই নাগরিক, তাই রাজনীতি তাহারা করিতে পারে। বিভিন্ন দলেও নাম লেখাইতে পারে (বিশেষ করিয়া যাহাদের বিচারের সম্মুখীন হইতে হয় নাই)। তাহাতে সাংবিধানিকভাবে আপত্তি জানাইবার কিছু নাই। কিন্তু দেশের সরকারি দল ও বিরোধী দলে তাহাদের অবাধ বিচরণ দেশবাসীর মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করিয়া চলিয়াছে। বিশেষ করিয়া সরকারে থাকা দলের উচ্চ পর্যায়ে তাহাদের পদচারণা সচেতন জনগণের চোখ এড়াইতেছে না। এমন নহে যে, যাহাদের হাত ধরিয়া এই সকল স্বাধীনতাবিরোধী অগ্রসর হইতেছে তাহারা ইহাদের ইতিহাস, ইহাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নহেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অতি চতুরতার সঙ্গে অর্থ ব্যয় করিয়া, ক্ষেত্রবিশেষে উেকাচের বিনিময়ে এই সকল ব্যক্তি ক্ষমতার উচ্চ শিখরে উঠিতে শুরু করিয়াছে। এই অপশক্তির প্রভাবে যদি কোনো ধরনের অঘটন ঘটে, তাহার দায় লইবে কে? তখন কিন্তু দায় লইবার কাহাকেও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। অতএব এখনো সাবধান হইবার সময় আছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানেন, ষড়যন্ত্রকারীরা তাহাকে কতটা কাঁদাইয়াছে। শুধু নিজেরই সঙ্গে প্রবাসে থাকা একমাত্র বোন ছাড়া নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়া পরিবারের সকলকে হারাইয়া আজো কাঁদিতেছেন। তিনি পার্লামেন্টে দাঁড়াইয়া, জনমানুষের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বারবার প্রশ্ন রাখিয়া যাইতেছেন; মস্ত বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন রাখিয়া চলিয়াছেন। পিতা, মাতা, ভাই, আত্মীয়-পরিজন হারাইয়া তিনি দেখিয়াছেন দশকের পর দশক বিচারহীনতা। পরিবারের বিয়োগই শুধু নহে, বিচার না পাইবার বেদনাও তাহাকে তিলে তিলে দংশন করিয়া চলিয়াছে। সেই অপশক্তি যদি তাহারই আসনের চারিপাশে ছায়া হইয়া ঢুকিয়া পড়ে তাহা হইলে আর বলিবার কিছু বাকি থাকে না। তিনি অবশ্যই জানেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। তবে তাহার অর্থ যে অন্ধ বিশ্বাসকে গ্রহণ করা নহে, ইহাও প্রধানমন্ত্রী ও তাহার দলের ত্যাগী কর্মীদের বুঝিতে হইবে। আমরা ইহাও বুঝিতে পারি, রাজনীতিতে পথের বিছানো কাঁটা পার হইতে হয়। কিন্তু সেই কাঁটা মাড়াইয়া পথ চলিতে চেষ্টা করিলে তাহা কেবল শঙ্কাই তৈরি করিবে। সুতরাং পথের কাঁটার মোকাবিলা পথেই হউক, তাহা যেন প্রাসাদে উঠিয়া না আসে। এই ব্যাপারে আমরা কেবল সতর্কই করিতে পারি, পদক্ষেপ লইবার দায়িত্ব কিন্তু সংশ্লিষ্টদের।