স্কুলে পড়া অবস্থায় রসায়ন ছিল তার সবচেয়ে পছন্দের বিষয়। রসায়নের প্রতি এই ভালোলাগা এবং ভালোবাসায় নতুন মাত্রা যোগ হয় কলেজে ওঠার পর। রসায়নের এক প্রিয় শিক্ষকা তাকে সবসময় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন রসায়ন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে। কলেজে পড়ার সময় ক্যান্সারে মারা গেলেন নানী; তখন রাইসার মনে প্রবল ইচ্ছে জাগে মেডিসিন্যাল ক্যামিস্ট্রি শেখা এবং কাজ করার। ক্যান্সার নিরাময়সহ মানব কল্যাণে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং করলেনও তাই।
বলছিলাম বাংলাদেশি তরুণ বিজ্ঞানী ড. রাইসা খান তারেকের গল্প। যুক্তরাজ্যের একটি সিন্থেটিক বায়োলজি কোম্পানিতে কাজ করছেন তিনি। নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিন্থেটিক কেমিস্ট্রির একটি উপ-গবেষণা দলের। জন্ম বাংলাদেশে হলেও রাইসার বেড়ে ওঠা সুইডেনে এবং পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছন যুক্তরাজ্যে। নটিংহাম ট্রেন্ট ইউনিভার্সিটি থেকে মেডিসিন এবং ফার্মাসিউটিক্যালস কেমিস্ট্রিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে রসায়নে অনার্স সম্পন্ন করেন। পরে মেডিসিন্যাল কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।
রাইসা জানান তার বর্তমান কাজগুলো মালটিডিসিপ্লিনারি। জীববিজ্ঞান, রসায়ন, কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল জ্ঞান, ইলেক্ট্রনিক এবং মেকানিক্যাল টিমসহ একাধিক ক্ষেত্রের গবেষকরা এতে একসঙ্গে যুক্ত।কোম্পানিটি বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য ইতোমধ্যে ৪৪৬ কোটি টাকা ফান্ডিংও পেয়েছে বলে জানান রাইসা।
সম্প্রতি রাইসা এবং তার দল একটি নতুন ডিএনএ সিন্থেসিস প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজ করছেন। এটা সিন্থেটিক বায়োলজি এবং স্বাস্থ্য গবেষণার সময় এর ব্যয় কমিয়ে এই ক্ষেত্রগুলোতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। স্বাস্থ্যসেবায়, ওষুধ শিল্পে, ডেটা স্টোরেজ এবং অন্যান্য অনেক শিল্পে কর্মরত বিজ্ঞানীদের কাজে ও গবেষণা ক্ষেত্রে ডিএনএ সিকোয়েন্স প্রস্তুত করার জন্য প্রয়োজনীয় সময়কে ব্যাপকভাবে কমিয়ে তাদের কাজের গতি বাড়ানোর সুযোগ করে দেবে এই প্রযুক্তি।
রাইসা এবং তার দল, একটা নভেল সেমিকন্ডাক্টার প্ল্যাটফর্ম ব্যাবহার করে নেক্সট-জেন ডিএনএ সিন্থেসিস প্রযুক্তি উৎকর্ষে কাজ করেছেন। এই প্রযুক্তি এখনো কোথাও ব্যবহৃত হচ্ছে না। রাইসা এবং তার দল সফল হলে এটা ডিএনএ সিন্থেসিসের প্রচলিত পদ্ধতিগুলোকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাবে বলে ধারণা তাদের।
এজন্য তারা ইতোমধ্যে বিনিয়োগ পেয়েছেন প্রায় ৪৪৬ কোটি টাকা। রাইসা বলেন, 'আমরা খুবই আশাবাদী, ইনশা-আল্লাহ, শিগগিরই বিশ্ববাসী দেখতে পাবে আমাদের এই প্রযুক্তির কার্যক্রম। এটা ব্যবহার করবে বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি এবং গবেষণাগার। ইতোমধ্যে আমরা আমাদের মেশিনের প্রোটোটাইপ বিশ্বের কিছু নামকরা গবেষণাগারে পাঠানোর কার্যক্রম শুরু করেছি।'
মজার ব্যাপার হলো রাইসা পুরোদমে একজন বিজ্ঞানী হলেও বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি জনপ্রিয় একজন ভ্লগার হিসেবে। "ড. রাইসা’স" নামে তার ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে বিজ্ঞানভিত্তিক ও স্বাস্থ্যসম্মত নানান খাবারের রেসিপি, বিভিন্ন দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে ঘিরে ট্রাভেল ফিল্ম (ব্লগ) এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও আপলোডের কারণে তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন। ইউটিউব ও ফেসবুক মিলে তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় দেড় মিলিয়ন। ইতোমধ্যে ফেসবুকে তার ভিডিওগুলো দেখা হয়েছে ১৩০ মিলিয়ন মিনিটেরও বেশি বার।
কাজের পাশাপাশি ব্লগিং ও ভ্লগিং-এ রাইসাকে সহযোগিতা করে থাকেন তার স্বামী। তিনি আইন বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন স্টার্টআপ নিয়ে কাজ করছেন। বিজ্ঞান গবেষণার কাজ, কন্টেন্ট তৈরির পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রী দুজনেই স্টার্টআপ ব্যবসা, কর্পোরেট নেতৃত্ব এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা নিয়েও কাজ করছেন। বাংলাদেশের মানুষ এবং তরুণ প্রজন্মকে মাথায় রেখে নতুন একটা প্রজেক্ট নিয়ে তারা ভাবছেন বলে জানান রাইসা।
রাইসা বলেন, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় কিংবা পর্যপ্ত মৌলিক জ্ঞানের অভাবে অনেক নারী-ই বিজ্ঞান গবেষণার কাজে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পায় না। এক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং আত্মউন্নয়ন জরুরি। বিজ্ঞানী হিসেবে ক্যারিয়ার গড়তে হলে প্রচেষ্টা ও অধ্যবসায়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।