দেশে দেশে আজ বাড়িয়া চলিয়াছে টান টান উত্তেজনা ও অস্থিরতা। এই সময় নার্ভ শক্ত করিয়া ধরিয়া রাখাই কঠিন। পৃথিবীবাসী আর কত ধৈর্য-সহ্যের পরিচয় প্রদান করিবে? সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় নিরন্ন ও হতদরিদ্র মানুষের চোখে আজ ঘুম নাই। দুই বৃহত অর্থনীতির দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ চলিবার পর বিশ্বব্যাপী দেখা দিল এক বিস্ময়কর মহামারি। কোভিড-১৯-এর ছোবলে মানুষ হইল জর্জরিত। তাহারা কিছু সময়ের জন্য নিজ গৃহে গৃহবন্দি হইয়া পড়িল। কী দুঃসহ ছিল সেই দিনগুলি! লকডাউনে আয়-রোজগার হারাইয়া অনেকের অনাহারে-অর্ধাহারে মরণদশা হইল। সেই কঠিন পরিস্থিতি আমরা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলা করিতে সক্ষম হইয়াছি। করোনার টিকা আবিষ্কার আমাদের মনে জ্বালাইয়া দেয় আশার প্রদীপ। কিন্তু করোনার অবসান না হইতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব আছড়াইয়া পড়িল দেশে দেশে। মানুষ আরও একবার হতবিহ্বল হইয়া পড়িল। একদিকে যুদ্ধ আর অন্যদিকে একের পর এক নিষেধাজ্ঞার জেরে বিশ্ব অর্থনীতি পর্যুদস্ত হইয়া পড়িল। আবির্ভাব ঘটিল বিশ্বমন্দার। করোনার প্রেক্ষাপটে কিছু কিছু দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হইল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশে দেখা দিল সর্বগ্রাসী প্রভাব। ইহাতে নূতন করিয়া যে অস্থিতিশীলতা তৈরি হইয়াছে, তাহার শেষ কোথায় ইহাই আজিকার বড় প্রশ্ন।
সম্প্রতি ইকোনমিস্ট তাহার প্রধান সম্পাদকীয়ের শিরোনাম করিয়াছে ‘ফ্রোজেন ইউরোপ’ নামে। এই শীতকালে ইউরোপে ঘর গরম করিয়া রাখিবার মতো গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকায় ১০ লক্ষাধিক লোক প্রাণ হারাইতে পারেন বলিয়া আশঙ্কা করা হইতেছে। যাহারা হিমায়িত হইয়া বেঘোরে মারা যাইতে পারেন, তাহাদের অধিকাংশই বয়স্ক ব্যক্তি, যাহাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা কম। এই জন্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করিয়াছে, রাশিয়ার জ্বালানি অস্ত্র হাজার হাজার মিসাইলের চাইতেও মারাত্মক পরিণতি ডাকিয়া আনিতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের অবস্থা এমনিতেই নাজুক। জ্বালানিসংকট ও মূল্যস্ফীতির কারণে সেখানকার মানুষ ধুঁকিয়া ধুঁকিয়া মরিতেছে। ইহার মধ্যে জার্মানি সবচাইতে বিপজ্জনক অবস্থায় রহিয়াছে। আর এই কারণেই দেশটিতে শুরু হইয়াছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী জার্মানিতে সরকারবিরোধী এক অভ্যুত্থানচেষ্টা ব্যর্থ করিয়া দিয়াছে সেই দেশের পুলিশ। এই জন্য অন্তত ২৫ জনকে গ্রেফতার করা হইয়াছে। দেশটির ডানপন্থী ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারা ইহার সঙ্গে জড়িত। তাহারা পার্লামেন্ট ভবন রাইখস্ট্যাগে হামলা চালাইবার পরিকল্পনা করিয়াছিল বলিয়া জানা যায়। ইহাতে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠিলেও ক্রেমলিন বলিয়াছে, ইহা জার্মানির অভ্যন্তরীণ বিষয়, ইহাতে তাহাদের হস্তক্ষেপ করিবার কোনো কারণ নাই। তবে ল্যাটিন আমেরিকার দেশ পেরুর পরিস্থিতি আরও শোচনীয়। সেইখানকার কংগ্রেস গতকাল প্রেসিডেন্ট পেডরো ক্যাসটিলোকে ইমপিচমেন্টের আওতায় আনিয়াছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুর্নীতির দায়ে তাহাকে গ্রেফতার করিয়াছে। ইহার আগে প্রেসিডেন্ট সরকার ভাঙিয়া দিয়া ক্ষমতা কুক্ষিগত করিতে চাহিয়াছিলেন। প্রথম কোনো বামপন্থী নেতা হিসাবে তিনি মাত্র এক বছর আগে নির্বাচিত হইয়াছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশটির সামরিক বাহিনীর প্রভাব-প্রতিপত্তির নিকট তিনি পরাস্ত হইলেন। পূর্ব ইউরোপের দেশ আলবেনিয়ায় বর্তমানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলিতেছে। সেখানে বিক্ষোভ চলাকালে প্রধান বিরোধী নেতা স্যালি বেরিশার মুখে ঘুসি মারিয়াছেন এক ব্যক্তি। ইহার আগে আমরা আফ্রিকার দেশ সুদানে সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বছরব্যাপী চলা আন্দোলন-সংগ্রামে ১২০ জনের প্রাণহানির কথা জানাইয়াছি। জানাইয়াছি কঙ্গোতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ২৭২ জন বেসামরিক মানুষ হত্যার কথাও। ফার্মগেট কেলেঙ্কারির ঘটনায় দক্ষিণ আফ্রিকায় বিরোধীরা সিরিল রামাফোসার পদত্যাগ ও নূতন নির্বাচন দাবি করিতেছে। আর দুর্নীতির দায়ে আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিনা ফার্নান্দেজ ডি কির্চনারকে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হইয়াছে। এইভাবে বলিতে গেলে অস্থিরতা কোথায় নাই, তাহা বলাটাই মুশকিল।
বাংলাদেশের কবি হেলাল হাফিজ লিখিয়াছেন, ‘নিউট্রন বোমা বোঝ/ মানুষ বোঝ না! যাহারা দেশে দেশে আজ যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা ছড়াইয়া দিতেছেন বা জিইয়া রাখিতেছেন, তাহারা সাধারণ মানুষের কথা বুঝিতে চাহেন না। ইতিহাস হইতে শিক্ষা লইয়া তাহাদের শুভবুদ্ধির উদয় কখন হইবে, তাহা আমরা কেহ জানি না।