‘পৃথিবীর কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়, আমাদের সমস্যাগুলিও না’—প্রতিভাবান অভিনয়শিল্পী চার্লি চ্যাপলিনের এই উক্তির হিসাব মিলিতেছে না। মহামারি করোনা ভাইরাসের ধাক্কায় খাদের কিনারায় পতিত হওয়া পৃথিবী নামিতেছে শুধু নিচের দিকেই! ‘যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ’ অবস্থার মধ্য দিয়া যাইতেছে আজিকার পৃথিবী। কোভিডের পিঠে ছড়িয়া সমগ্র বিশ্বে যখন অন্ধকার নামিয়া আসিয়াছিল, তখনো আন্দাজ করা যায় নাই—সামনের রাস্তা হইবে আরো বিপত্সংকুল। মহামারির হাত ধরিয়া চরম মন্দা আসিতে পারে বলিয়া আশঙ্কা করা হইয়াছিল যদিও; কিন্তু আশঙ্কা যে মহাশঙ্কায় পরিণত হইয়া ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস ফেলিবে, তাহা সকলের অজানাই ছিল। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছিন্নভিন্ন হইবার পাশাপাশি কোভিডের অভিঘাতে বৈশ্বিক উৎপাদন-বিপণন চিড়েচ্যাপটা হইয়া উঠিলেও মানুষ আশায় বুক বাঁধিয়াছিল এই ভাবিয়া যে, তিমিরের অবসান ঘটিবেই। বিশ্ব ও সভ্যতা বহু পিছনে পড়িয়া যায় যদিও, তবে শেষ পর্যন্ত তীর অবধি উঠিতে পারা গিয়াছিল; কিন্তু রাতারাতি বিশ্ব আটকাইয়া পড়ে আরেক চোরাবালিতে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম তথা কোভিড মহামারিকে বছর তিনেকের যুদ্ধে বাগে আনিতে পারিলেও স্বয়ং মানুষের হাত ধরিয়া বিশ্বে যেই মহামারি নামিয়া আসে, কোনোমতেই তাহার সহিত পারিয়া উঠা যাইতেছে না। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনের মাটিতে বোমা ফেলিয়া রাশিয়া যেই আঁধারকে আমন্ত্রণ জানায়, তাহাতে পথ হারাইয়া ফেলিয়াছে পৃথিবী! করোনা মহামারিতে ধুঁকিতে থাকা মানুষের পিঠে ইউক্রেন যুদ্ধ ক্রমাগতভাবে যেইভাবে চাবুক মারিয়া চলিয়াছে, তাহাতে ‘রাত পোহাইবার কত দেরি’—তাহাই এখন সকলের জিজ্ঞাসা।
একটি একটি করিয়া দিন যুক্ত হইয়া ইউক্রেন যুদ্ধের ২৯১তম দিবসে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে বিশ্ব। অথচ এই দীর্ঘ সময়কালে যুদ্ধ থামাইবার কোনো লক্ষণ তো দেখা যাইতেছেই না, বরং নূতন নূতন হিসাবনিকাশ ও সমীকরণ সামনে আসিতেছে ক্রমাগতভাবে। এই যুদ্ধে কী দেখে নাই বিশ্ব! জ্বালানিসংকটের জাঁতাকলে পড়িয়া দেশে দেশে ব্যাপকভাবে উৎপাদন বিঘ্নিত হইতেছে। খাদ্যসংকট চরম হইয়াছে। কি উন্নত, কি পিছাইয়া পড়া দেশ—সকলকেই ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত করিয়া তুলিয়াছে মূল্যস্ফীতির পাগলা ঘোড়া। দেউলিয়া হওয়া সরকারগুলিকে বরণ করিতে হইয়াছে নজিরবিহীন পরিণতি। উন্নত বিশ্বের ঘরেই আলো জ্বলিতেছে না, এই অবস্থায় অমানিশা কাটিবার চিন্তা করাটা উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য স্বাভাবিকভাবেই বাতুলতা। বাস্তব চিত্রও তাহাই। অস্থিরতা লাগামহীন হইয়া উঠিতেছে এই সকল দেশে। কিছু দেশে এমন সকল ঘটনা ঘটিতে দেখা যাইতেছে যে, কয়েক বছর পূর্বেও যাহা ছিল কল্পনাতীত! ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ ভাঙিয়া পড়িয়া বিশ্বব্যবস্থায় যেইভাবে ‘নূতন মেরু’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলিতেছে, একইভাবে জটিল সকল অঙ্ক মিলাইবার চেষ্টা চলিতেছে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরে। অবস্থায় এমন, সরকারগুলিকে শুধু মাপিয়া মাপিয়া পথ হাঁটিলেই চলিবে না, বিশ্ব রাজনীতির জটিল মঞ্চে দাবার ঘুঁটি চালিতে হইবে অতি সন্তর্পণে। ঘরে-বাহিরে এত অস্থিরতা, পা টিপিয়া টিপিয়া চলা—এই সকল কিছুর জন্য দায়ী ‘অর্থশূন্য পকেট’! ‘সকল কিছু স্বাভাবিক আছে, চলার মতো যথেষ্ট টাকাকড়িও আছে’—এই ধরনের সস্তা কথা বলা হইতেছে যদিও, তথাপি দৈনন্দিন জীবনযাপনে নিজের পকেটে হাত দিয়া সত্য-মিথ্যা ঠিকই বুঝিতেছে মানুষ। এলসি খুলিতে গিয়া মানুষ ঠিকই টের পাইতেছে সংকট কতটা গভীর!
যত কথাই বলা হউক, যত বাজিই ফুটানো হউক, মিছিল-মিটিং যতই চলুক, বর্তমান বাস্তবতা হইল বিশ্বের পরিস্থিতি ভালো নহে, ভালো নাই কোনো দেশ। শিউরে নূতন বছরের নবসূর্য উঁকি মারিতে চলিয়াছে বটে; কিন্তু আমাদের সামনে কোনো সুসংবাদ নাই। সকল মহল হইতে আসিতেছে একটিই বাক্য—‘২০২৩ সাল হইবে মন্দার বৎসর’। এই আশঙ্কার বাণীকে উপেক্ষা করিবে—সাধ্য কাহার! ভূ-রাজনীতির কমপ্লিকেটেড ক্যালকুলেশনকে ছাপাইয়া ‘তৈল’ লইয়া বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যেই তেলেসমাতি শুরু হইয়াছে, তাহাতে সামনের দিনগুলি যে আরো বিবর্ণ হইয়া উঠিবে—এই কথা অনস্বীকার্য। তৈল-গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে কলকারখানাগুলি যেইভাবে গুটাইয়া যাইতেছে, তাহাতে মালিক-শ্রমিক যে রাস্তায় নামিয়া পড়িবে না—ইহারই-বা গ্যারান্টি কোথায়? অর্থনীতির বেগতিক অবস্থা দেখিয়া যুক্তরাজ্যের মন্ত্রীকে পর্যন্ত বলিতে শোনা গিয়াছে, ‘আমরা চরম সত্যের মুখে এসে দাঁড়িয়েছি। সত্যকে মেনে নেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে দ্বিতীয় রাস্তা নেই।’ কিন্তু মুশকিল হইল, আমরা সত্যকে মানিতে চাহি না! ব্যর্থতার দায় লইতে চাহি না! ইহার পরও আমরা বলিব—‘অমানিশা কাটিয়া যাউক, আসুক আলো’।