কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম ইউনিয়নের নিমসার বাজার এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সবজির পাইকারি বাজার। ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়কের মাঝখানের অংশ (বিভাজক), দুই পাশের সড়ক ও সওজের জায়গা এবং নিমসার-বরুড়া সড়কের জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে নিমসার বাজার। জমি দখল করে প্রভাবশালীরা গড়ে তুলেছেন সারি সারি কাঁচামালের অসংখ্য অবৈধ আড়ত, বিভিন্ন দোকানপাট, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়সহ নানা স্থাপনা। তিন বছর আগে নামমাত্র উচ্ছেদ অভিযান হলেও ফের গড়ে উঠেছে এসব স্থাপনা। এসব স্থাপনার কারণে সেখানে প্রতিদিনই যানজটে আটকা পড়ে বিভিন্ন পরিবহনের যাত্রী। সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পথচারী, বাজার লাগোয়া স্কুল-কলেজের শত শত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে। দখলদাররা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী, তাই সড়কের জায়গায় তাদের নির্মিত অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের নির্লিপ্ততার অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, জেলার ১৭টি উপজেলার চাষিরা তাদের শ্রম-ঘামে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের তরি-তরকারি পাইকারি ও খুচরা বিক্রির জন্য এ হাটে আনেন। ঢাকা, ভৈরব, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের সমাগমে বছরের সবসময় নিমসারের এ সবজির হাট থাকে সরগরম। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয় কেনাবেচা। এরপর পাইকাররা শাকসবজি ট্রাকে বোঝাই করে নিয়ে যান যে যার গন্তব্যে। এ হাটে প্রতিদিন প্রায় শতকোটি টাকার সবজি কেনাবেচা হয় এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে যা দেশের বিভিন্ন স্থানের মানুষের চাহিদা পূরণে অবদান রাখছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সওজের জায়গা দখলযজ্ঞে মেতে উঠেছেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ার স্থানীয় প্রভাবশালীরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নিমসার উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে মহাসড়কের দুইমুখী লেনের মাঝখানের বিভাজকের জায়গাটিও দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে মোকাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয়সহ অর্ধশতাধিক শাকসবজি-কাঁচামালের আড়ত, ফলের দোকান, খাবারের কয়েকটি হোটেল ও পণ্যসামগ্রীর দোকান। তবে কত টাকা অগ্রিম (জামানত) ও ভাড়ায় দোকানগুলো চলছে—এ নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি খাবার হোটেলের এক কর্মচারী জানান, এই হোটেলের মাসিক ভাড়া ১২ হাজার টাকা এবং এককালীন ৫ লাখ টাকা অগ্রিম দিতে হয়েছে। একই শর্তে আলু বিক্রির আড়তের এক কর্মচারী জানান, ৮ ফুট প্রস্থ ও ১০ ফুট দৈর্ঘ্যের এই আড়তটি ভাড়া নিতে অগ্রিম দিতে হয়েছে ৪ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসের ২-৩ তারিখের মধ্যে ভাড়া পরিশোধ করতে হয় ৮ হাজার টাকা। তারাসহ অন্তত ১৪ জন দোকানি বলেন, অগ্রিম ও মাসিক ভাড়া ছাড়াও খাজনাসহ বিভিন্ন অজুহাতে চাঁদা নিতে আসে, দিতে হয়। এই বিভাজকের সকল দোকানই এভাবে চলছে। তারা বলেন, এই বাজারে যার প্রভাব যত বেশি, তার রোজগারও বেশি। আলেক হোসেন নামের এক আড়তদার বলেন, ১২ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে তিনি দোকান ভাড়া নিয়েছেন। কিন্তু তাকে দোকানের কোনো কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, সরকারি জায়গায় দোকানঘর তা জেনেই নিয়েছেন, কাগজ পাবেন কোথায়, ঝুঁকি নিয়েই দোকান নিয়েছেন। এ অবস্থায় উচ্ছেদের ভয় তো আছেই। কয়েক জন ব্যবসায়ী বলেন, ‘যারা ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন, তাদের সবাই আশপাশের এলাকার প্রভাবশালী এবং তাদের অনেকে সরকারি দলের নেতাকর্মীও। তারা এই বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। প্রশাসন উচ্ছেদ করলে তারা (দখলদার) আবারও নতুন করে ঘর তৈরি করে দেবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। এ ব্যাপারে আমরা চিন্তাও করি না। ঘর বৈধ নাকি অবৈধ তাও বলতে পারব না।’ তবে তারা ব্যবসার ক্ষতি বা হয়রানির ভয়ে কেউ দখলদারের নাম মুখে নেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাজারের ১৮ জন ব্যবসায়ী অন্তত ২৫ জন প্রভাবশালী নাম বলেছেন, যারা সড়কের জায়গায় অবৈধভাবে ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। বাজারের অগ্রণী ব্যাংকের সামনে নিমসার-বরুড়া সড়কের পাশে সওজের জায়গা দখল করে অন্তত ৪০টি পাকা দোকানঘর নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এসব স্থাপনার কারণে মহাসড়কের এই এলাকাটি অনেকটা অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। যানজটসহ প্রায় সময় ঘটছে দুর্ঘটনা।
জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় বাজারটিতে অভিযান চালিয়ে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিল সওজ। এক মাস না যেতেই সেখানে নতুন করে দোকানঘর নির্মাণের হিড়িক পড়ে যায়।
স্থানীয় মোকাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. সাহেব আলী সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারিভাবে ইজারার ডাক হয় এ বাজারের ১৩ শতক ভূমির। কিন্তু বাজারটি প্রায় ২০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। যে যার মত করে দখল করছে। এ বছর বাজারটির ইজারা হয়নি। কে চালায়, কীভাবে চালায়—কিছুই জানি না। এ বাজার ঘিরে সওজের ভূমি দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
তবে নিমসার বাজারে সওজের ভূমিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি স্বীকার করে বুড়িচং উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. গোলাম ফারুক সাংবাদিকদের বলেন, ১৯৬৩ সালে সওজের জন্য এখানে ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। এসব ভূমি যাদের ছিল, তারা সেখানে দোকানপাট তুলেছেন। পুরো বাজারে টিনের চালার যতগুলো দোকান আছে, প্রায় সবগুলোই সওজের সম্পত্তির ওপর নির্মিত। তিনি আরো বলেন, আমরা দোকান নির্মাণ করি না। মূলত যারা ব্যবসায়ী, তারাই এসে বলেন, দোকান তুলবেন। এতে আমরা বলি, সরকার প্রয়োজনে যে কোনো সময় ভেঙে ফেলবে, তারা এসব মেনেই দোকান তুলে আমাদেরকে ভাড়া দেয়। বিষয়টি অবৈধ হলেও অমানবিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। তবে সড়ক বিভাগ যে কোনো সময় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে তাদের সম্পত্তি বুঝে নিতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
হাইওয়ে কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ বলেন, নিমসার বাজারে সওজের জায়গায় অবৈধ স্থাপনার কারণে অনেক সময় সেখানে ধীরগতিতে যানবাহন চলাচল করতে হয়, জট লেগে যায়, জনদুর্ভোগও সৃষ্টি হয়। তাই ব্যবসায়ীদের বলেছি, তারা যেন মহাসড়কে ট্রাক রেখে মালামাল লোড-আনলোড না করে এবং গাড়ি না রাখে। কেউ নির্দেশনা না মানলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সওজ-কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীতি চাকমা বলেন, নিমসার বাজারটি মহাসড়কের লাগোয়া। তাই মহাসড়কের দুই পাশ ঘিরে বাজারের বিস্তৃতি রয়েছে। সড়কের মাঝখানের অংশে এবং দুই পাশের সড়কের জায়গায়ও ঘর নির্মাণের অভিযোগ আছে। এছাড়া বাজারের ব্যাংকের সামনে সড়কের জায়গায় যেসব অবৈধ স্থাপনা আছে, সেগুলোও উচ্ছেদ করা হবে। এ ব্যাপারে বুড়িচং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছি। দখলদাররা যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন শিগিগর সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হালিমা খাতুন বলেন, নিমসার বাজারে সওজের ভূমিতে বেশকিছু অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলার বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। এ বিষয়টি সড়ক বিভাগ থেকেও আমাকে জানানো হলে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার জন্য উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিগিগরই অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে বলে আশা করছি।