পৃথিবীর মাসলম্যান বা শক্তিধরদের দাপটে পৃথিবীবাসী আজ অতিষ্ঠ হইয়া পড়িয়াছে। তাহাদের কোপানলে পড়িয়া পৃথিবী শেষ হইয়া যাইতে বসিয়াছে। বলবান দেশগুলি আজ আমাদের পরমাণু অস্ত্রেরও ভয়ভীতি প্রদর্শন করিতেছে। কেহ কেহ উৎক্ষেপণ বা মোতায়েন করিতেছে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম)। যেমন—চলতি সপ্তাহে যুদ্ধবাজ একটি দেশ তাহার দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে যে আরএস-২৪ ইয়ার্স নামক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করিয়াছে, তাহা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে জাপানের হিরোশিমায় নিক্ষেপিত ‘লিটল বয়’ পরমাণু বোমার চাইতে ১২ গুণ অধিক শক্তিশালী। দূরপাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী দুইটি শক্তিশালী দেশেও আঘাত হানিতে সক্ষম। এইদিকে তলে তলে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেছে বিশ্বের বৃহত্তম সামরিক জোট। এই সকল কীসের আলামত?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করিয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হইলে পূর্বের দুই বিশ্বযুদ্ধের চাইতে অনেক বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটিবে। আর তাহা পরমাণু যুদ্ধের রূপ নিলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়িবে এই পৃথিবী ও মানবকুল। পৃথিবীতে মোট ১৯৬টি দেশের মধ্যে মাত্র ৯টি দেশ পরমাণু শক্তিসম্পন্ন। তাহাদের নিকট রহিয়াছে ১৬ হাজার ৩০০টি পারমাণবিক বোমা। পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শহরের প্রতিটি শহর ধ্বংস করিতে গড়ে দুই থেকে তিনটি পারমাণবিক বোমাই যথেষ্ট। যাহারা এইভাবে পরমাণু বোমার ভয় দেখাইতেছে, তাহারা যে বর্তমানে ভালো আছে—এমনটি নহে। অর্থনীতি, রাজনীতি, নিরাপত্তা প্রভৃতি দিক দিয়া তাহারা অভ্যন্তরীণভাবেও রহিয়াছে বেকায়দায়; কিন্তু তাহাদের হুংকার থামিতেছে না। যেই ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পৃথিবীব্যাপী অস্থিরতা দেখা দিয়াছে এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিসহ দেশে দেশে মানুষের নাভিশ্বাস উঠিতেছে, সেই যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ দেখা যাইতেছে না। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ দখলে ২ লক্ষ সৈন্য মোতায়েনের প্রস্তুতি লইতেছে সেই যুদ্ধপ্রিয় দেশটি। তাহার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনের কয়েকটি শহর ইতিমধ্যে বিদ্যুত্হীন হইয়া পড়িয়াছে। দেশটিতে নূতন করিয়া ৭৬টি মিসাইল নিক্ষেপ করা হইয়াছে। বিশেষত ৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালাইবার ফল হইতেছে আরো মারাত্মক। কেননা এই তীব্র শীত ও তুষারপাতের মধ্যে বিদ্যুতের অভাবে ঘর গরম করিতে না পারিয়া মারা যাইতে পারে হাজার হাজার মানুষ। বিশেষত শিশু ও বৃদ্ধরা রহিয়াছে সবচাইতে ঝুঁকির মুখে। সমগ্র ইউরোপে সেই দেশটি যেইভাবে জ্বালানিশক্তিকে যুদ্ধাস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করিতেছে, তাহাতে এই শীতকালে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাইতে পারে। সেই ক্ষেত্রে এই জ্বালানি অস্ত্র হইতে পারে মিসাইলের চাইতেও ভয়ংকর।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভ্লদিমির জেলেনস্কি তাহার নাগরিকদের রেলওয়ের আন্ডারগ্রাউন্ডে আত্মরক্ষার নির্দেশ দিয়াছেন। তাহাদের রাস্তায় বাহির হইয়া আসিতে নিষেধ করিয়াছেন। স্পষ্টতই ইউক্রেনের মানুষকে ভাতে, পানিতে ও বিদ্যুতে মারিবার চেষ্টা চলিতেছে। সেইখানে আজ যুদ্ধের নামে যে ধ্বংস ও তাণ্ডবলীলা চলিতেছে, তাহা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। ইহা যুদ্ধাপরাধ ছাড়া আর কিছুই নহে। আর মাস দুইয়েক পর ইউক্রেনে হামলার এক বৎসর পূর্ণ হইবে; কিন্তু এই যুদ্ধের কারণে পৃথিবী জুড়িয়া যেইভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্যে ধস নামিয়াছে, বিশ্বমন্দার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়াছে, তাহা অত্যন্ত উদ্বেগজনক; কিন্তু মোড়ল দেশগুলি ইহার কোনো তোয়াক্কা করিতেছে না। গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের নামে প্রধানত দুই আদর্শ বহনকারী শক্তি বিশ্বের ৮০০ কোটি মানুষকে জিম্মি করিয়া ফেলিয়াছে। একদল চাহিতেছে ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হইলে নানা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত আক্রমণকারী দেশটির জীবনীশক্তি নিঃশেষিত হইয়া আসিবে। তাহাতে তাহার ও তাহার সরকারের পতন হইবে। আরেক দল ভাবিতেছে, এই অবস্থায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়া যাউক। কেন জানি তাহাদের ধারণা, এই বিশ্বযুদ্ধে এইবার তাহাদের জয় হইবে এবং ইহার মাধ্যমে তাহারা এক নূতন বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক হইয়া উঠিবেন; কিন্তু একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র ছাড়া তাহারা বিশ্ববাসীকে আর কী উপহার দিবেন, তাহা আমরা আজও বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছি না। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির কি অবসান হইবে না? ইউক্রেনসহ বিশ্বের দেশে দেশে যেই সকল অসহায় নরনারী, শিশু ও বৃদ্ধ আর্তনাদ করিতেছেন, তাহাদের কান্না কি থামিবে না?