স্বাধীনতার পর হইতে খুব খারাপ দশার ভিতর দিয়াই আমরা প্রতিদিনই অল্প অল্প করিয়া ভালো করিতেছিলাম। ভালো করিতেছিলাম এই অর্থে যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পর বিশ্বের সমীহযোগ্য অর্থনীতিবিদরা বলিয়াছিলেন যে, বাংলাদেশের মতো দেশ যদি তাহাদের অর্থনৈতিক ভয়াবহ ভগ্নদশা হইতে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে, তাহা হইলে বিশ্বের সবচাইতে খারাপ দেশটিও আশার আলো দেখিতে পারিবে। অর্থাৎ সেই খারাপ দেশটিও একদিন হয়তো মাথা তুলিয়া দাঁড়াইতে পারে। বাংলাদেশ এমনই একটি অসাধারণ উদাহরণ ছিল। বাংলাদেশ কোথা হইতে কোথায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে—এই সংক্রান্ত পরিসংখ্যান আন্তর্জালে টোকা দিলেই বিপুল পরিমাণে পাওয়া যাইবে। তবে এতখানি গৌরচন্দ্রিকার মূল কারণ হইল—আপাতত সেই সোনালি উত্থানের গ্রাফ থমকাইয়া গিয়াছে। এবং স্পষ্ট করিয়া বলা ভালো, এই গ্রাফ এখন নিচের দিকেই নামিতে থাকিবে। বিশ্বের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে ইহাই অপ্রিয় বাস্তবতা। এই বাস্তবতা মানিয়া অতঃপর যাবতীয় আপত্কালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা আবশ্যক।
আমরা একটি আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে বাস করিতেছি। একটি আন্তঃসংযুক্ত সময়ে আমাদের সমস্যা এবং সংকটও বিনিসুতার মালার মতো গাঁথিয়া আছে। সুতরাং সামনে কী কী ঝড় সামলাইতে হইবে, তাহা বুঝিতে তৃণলতা হইয়া আমাদের দৃষ্টি দিতে হইবে বড় বড় মহিরুহের দিকে। সেই দিকে আমরা কী দেখিতে পাইতেছি? ইউরো জোন মন্দার দিকে আগাইয়া যাইতেছে—ইহা নিশ্চিত। ইহার প্রভাব কতটা গভীর কিংবা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হইবে, এখন ইহাই সবচাইতে বড় প্রশ্ন। ইতিপূর্বে আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে—চলমান ইউক্রেন-রুশ যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট হইতে ইউরোপ শিগগিরই মুক্তি পাইবে না। ২০২৩ সালের শীতকাল ইউরোপের জন্য আরও ভয়ংকর হইবে। আসলে দুর্যোগের কৃষ্ণমেঘ এখনই দিগন্তে দৃশ্যমান হইতে শুরু করিয়াছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে দেশে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিগুলি ধসিয়া পড়া শুরু করিতে পারে। ইহার প্রভাবে বিশ্বের দেশে দেশে দারিদ্র্য বৃদ্ধির পাশাপাশি তৈরি হইতে পারে খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ। এমনিতেই এই মুহূর্তে বিশ্বের ৪৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে রহিয়াছে বলিয়া জানাইয়াছেন বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অ্যাক্সেল ভ্যান ট্রোসেনবার্গ। অন্যদিকে চাকুরি হারাইতে পারেন পৌনে ২ লক্ষ মার্কিন নাগরিক। এই আশঙ্কা করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক অব আমেরিকা। পাশাপাশি ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্ব বাড়িয়া সাড়ে ৫ শতাংশে দাঁড়াইতে পারে। চীন এবং জাপানের মতো শক্তিশালী অর্থনীতির দেশও মন্দার ছোবলে পড়িয়াছে। চীনা মুদ্রা ইউয়ান এবং জাপানি মুদ্রা ইয়েনের পতনে দেশ দুইটির অর্থমন্ত্রীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়িয়াছে।
এইদিকে, ইউরো জোনের অর্থনীতির আশু উত্তরণের তেমন সম্ভাবনা নাই বলিয়া জানাইয়াছেন অর্থনৈতিক পরামর্শক সংস্থা স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পোর গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের অর্থনীতিবিষয়ক প্রধান কেনেথ ওয়াট্রেট। এই যখন অবস্থা তখন জ্বালানি পণ্যসংক্রান্ত ওয়েবসাইটগুলিতে দেখা যাইতেছে, সম্প্রতি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১০ শতাংশের অধিক কমিয়া গিয়াছে। গত সপ্তাহে মারবান ক্রুডের (যাহা বাংলাদেশ আমদানি করে) দাম নামিয়াছে ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারে—যাহা ছিল চলতি বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন; কিন্তু বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কর্মকর্তারা বলিতেছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তৈলের মূল্য কমিবার সুবিধা ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে পাওয়া যাইতেছে না। অর্থাৎ মূল্য কমিবে না! আবার, সম্প্রতি বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলিয়াছেন যে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্যাস আমদানিতে যেই ভর্তুকি দেওয়া হয়, তাহা এখন হইতে জনসাধারণকে পরিশোধ করিতে হইবে। যদিও বাস্তবতা হইল—সকল কিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণকেই পরিশোধ করিতে হয়।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির হাত ধরিয়া পরিবহন ও কলকারখানায় পণ্যের উত্পাদনমূল্য যেমন বৃদ্ধি পাইতেছে, তেমনি বিশ্বমন্দায় রপ্তানির উপর পড়িতে যাইতেছে নেতিবাচক প্রভাব। জ্বালানিসংকটের হাত ধরিয়া বিদ্যুতের সংকট তো রহিয়াছেই। এই অবস্থায় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে যাহারা দায়িত্বে রহিয়াছেন—তাহাদের জন্য এই সংকট হইল—‘ডু অর ডাই’। সুতরাং এই অবস্থায় প্রতিটি পদক্ষেপই ফেলিতে হইবে অত্যন্ত সাবধানে। অন্যথায় পা পিছলাইয়া যাইবার প্রবল আশঙ্কা থাকিবে।