এই সময়ে পায়ের যত্ন

শীতের হাওয়া আমাদের ত্বককে করে তোলে শুষ্ক। শীতের শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ত্বকের কোষের মরে উল্লেখযোগ্য হারে। মৃত কোষের স্তর জমে ত্বকের ওপর, এজন্য ত্বক দেখায় রুক্ষ, শুষ্ক আর প্রাণহীন। ত্বকের বিভিন্ন স্থানে ফেটে যাওয়া ও একটা সাধারণ সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। শরীরের ঠোট এবং পায়ের গোড়ালি ফাটা এসময় খুবই সাধারণ ঘটনা। যাদের ত্বকে সমস্যা থাকে তাদের পায়ের গোড়ালি ফেটে রক্তও বেড় হয় অনেক সময়। শরীরের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অংশ পা। সারাদিন বিভিন্ন কাজে হাঁটা-চলা করতে হয়, তাই ধুলো ময়লা আর দূষণ বেশি আক্রান্ত করে আমাদের পায়েই। শীতকালীন আর দশটা ত্বকের সমস্যা চেয়ে পায়ের সমস্যা একটু বেশিই হয়। এসময় পায়ের ত্বকের প্রয়োজন হয় বাড়তি যত্নের। 

foot care

পায়ের গোড়ালি ও তালু ফাটা থাকলে হাঁটতে চলতে যেমন অসুবিধা হয়, দেখতেও অসুন্দর লাগে। সাধারণত অযত্ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে পা ফাটে। কখনো ত্বকে জমতে থাকা আর্দ্রতার কারণেও এমনটি হতে পারে। পুরো শরীরের মধ্যে পা ও এর তলাটাই সবচেয়ে শুষ্ক। কেননা দেহের অন্যত্র ত্বকের মাঝে তৈল গ্রন্থি থাকলেও পায়ের তালুতে তা নেই। কেবল আছে ঘর্মগ্রন্থি। যার ফলে পা শুষ্ক হয়ে পড়ে ও ত্বক ফেটে যায়। যখন অল্প বয়স থাকে, তখন এসব সমস্যা দেখা দেয় না।

যত বয়স বাড়ে সমস্যা শুরু হয়। ত্রিশ বছর বয়স হলে আরও বেশি করে যত্ন করতে হয়— না হলে সমস্যা বাড়ে। গোড়ালি ফাটার সমস্যায় আক্রান্ত হলে রেহাই পাওয়া বেশ কষ্টকর, তাই ভালো হয় সমস্যা দেখা দেওয়ার আগেই পায়ের নিয়মিত যত্ন নেওয়া। পায়ের নীচে বা গোড়ালির আশপাশে শক্ত ও শুষ্ক ত্বক, মরা চামড়া এবং ত্বকে ফাটল ধরার সমস্যা অনেকেরই হয়ে থাকে, বিশেষ করে শীতকালে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়। তবে সঠিকভাবে দেখভাল করলে পায়ের ত্বক নরম ও মসৃণ হয়ে ওঠতে পারে। চলুন, জেনে নেওয়া যাক পায়ের সৌন্দর্য ফেরাতে কি করবেন—

foot care

পায়ের যত্ন তিন ধাপে করতে হবে

স্ক্রাবিং

স্ক্রাবিং বিভিন্ন ভাবে করা যায়। ঘরে তৈরি বিভিন্ন প্যাক ব্যবহার করে স্ক্রাবিং করা যায়। আবার দোকানে রেডিমেড  স্ক্রাবার পাওয়া যায় সেগুলো দিয়েও স্ক্রাব করা যায়।

এক্সফোলিয়েট: এক্সফোলিয়েশনের মাধ্যমে পায়ের পাতা থেকে সহজেই মৃত ত্বক অপসারণ করা যায়। এই ফুট স্ক্রাব কিনতে পাওয়া যায় দোকানগুলোতে; আবার ফল, মধু, চিনি এবং গরম পানি মিশিয়ে বাড়িতেও তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে। এছাড়া, পা এক্সফোলিয়েট করার জন্য বিভিন্ন প্রোডাক্টও ব্যবহার করা যেতে পারে।

পিউমিক স্টোন বা ফুট ফাইল ব্যবহার: পিউমিক স্টোন বা মেটাল ফুট ফাইল পায়ের শুষ্ক, শক্ত ত্বক এবং কড়া পড়ে যাওয়া ত্বক অপসারণ করতে সাহায্য করে। পিউমিক স্টোন হল প্রাকৃতিক লাভা পাথর, যা পায়ের মরা চামড়া অপসারণ করতে সাহায্য করে। এটি ব্যবহারের প্রথম ধাপে ডেড স্কিন নরম করতে কিছুক্ষণ গরম পানিতে পা ভিজিয়ে রাখতে হবে।  তারপর একটি পিউমিক স্টোন বা ফুট ফাইল নিয়ে ডেড স্কিনের উপর বৃত্তাকার গতিতে আলতোভাবে ঘষতে হবে। ডেড স্কিন ওঠে গেলে পা ধুয়ে ও ভালোভাবে শুকিয়ে নিয়ে ভালো লোশন, ক্রিম বা তেল লাগাতে হবে।

উষ্ণ গরম পানিতে পা ভিজিয়ে রাখা: হালকা গরম পানিতে কিছুক্ষণ পা ভিজিয়ে রাখলে শক্ত চামড়া ও ডেড স্কিন আলগা হয়ে যায়। এটি পায়ে রক্তসঞ্চালনকেও উন্নত করে এবং ত্বককে আবার শুষ্ক হওয়া থেকেও রক্ষা করতে পারে। পা ভেজানোর আগে অল্প পরিমাণ ভিনেগার গরম পানিতে যোগ করতে হবে। ভিনেগার পা জীবাণুমুক্ত করতে এবং পায়ের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করবে। এছাড়াও নিম্নলিখিত উপাদানগুলির মধ্যে যেকোনোটি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে—

foot care

লেবুর রস: গবেষণা অনুযায়ী, লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড মৃত ত্বক এবং শক্ত চামড়া দূর করতে পারে। তবে এ বিষয়ে গবেষণা সীমিত। লেবু ত্বককে মসৃণ করতে পারে। লেবুর রসের সাথে সামান্য চিনি মিশিয়ে মিশ্রণটি দিয়ে রুক্ষ জায়গায় আলতো করে ঘষতে হবে, তারপর ৫-৭ মিনিট রেখে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

এপসম লবণ: এপসম লবণ মূলত ম্যাগনেসিয়াম সালফেট নামক খনিজ যৌগের একটি স্ফটিক রূপ। পানিতে এপসম লবণ গুলে তাতে পা ভিজিয়ে রাখতে হবে ২০ মিনিট। তারপর পা এক্সফোলিয়েট করতে ফুট ব্রাশ বা পিউমিক স্টোন ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পায়ের মরা চামড়া অপসারণ হতে পারে এবং ত্বকের হাইড্রেশন বাড়াতে পারে।

ওটমিল স্ক্রাব: ওটমিল ও গোলাপ জল সমান করে নিয়ে মিশিয়ে আলতো করে পায়ে এই স্ক্রাব লাগাতে হবে। ২০-৩০ মিনিট রেখে তারপর পা এক্সফোলিয়েট করার জন্য ফুট ব্রাশ ব্যবহার করতে হবে। এরপর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে পা ধুয়ে, শুকিয়ে লাগাতে হবে ভালো লোশন, ক্রিম বা তেল।

foot care

ক্লিন্সিং

পা ক্লিন রাখার জন্য বিভিন্ন প্যাক ব্যবহার করা যায় এতে ত্বকের নতুন ডেথ সেল জমা হয় না এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক হয় এতে পায়ের ত্বক ভালো হয়।

দই আর মধুর মাস্ক লাগান, বাড়িতে পাতা দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড ফিরিয়ে আনবে আপনার ত্বকের হারিয়ে যাওয়া আর্দ্রতা। সঙ্গে মিশিয়ে নিন এক বড় চামচ মধু, ১০-১৫ মিনিট সময় পর্যন্ত রেখে দিন, তারপর সামান্য গরম জলে ধুয়ে কোনো ময়েশ্চরাইজার লাগান।

অলিভ অয়েল আর চিনি-অলিভ অয়েল ত্বকে আর্দ্রতা জোগায়, চিনি কাজ করে স্ক্রাবার হিসেবে। দুই বড় চামচ অলিভ অয়েল ও চিনি মিশিয়ে নিন। তারপর বেশ করে ঘষে ঘষে লাগান হাতে ও পায়ে। ১৫ মিনিট পর তেলটা টেনে যাবে। তখন ধুয়ে ভালো করে ক্রিম লাগিয়ে নিন। দিনে দুই থেকে তিনবার এমনটা করতে পারেন।

তাজা অ্যালোভেরা জেল আর কয়েক ফোঁটা ভিটামিন ই তেল একসঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে পায়ে লাগান। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগিয়ে নিন।

  • পাকা কলা, মধু আর অলিভ অয়েল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন।  ৫-৭ মিনিট ম্যাসাজ করুন হাতে। অল্প গরম জলে ধুয়ে নিন এবং লাগিয়ে নিন ময়েশ্চরাইজার।
  • বেসনের সঙ্গে মধু, হলুদ বাটা, অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করে পায়ে ও গোড়ালিতে লাগাবেন। ২০ মিনিট পর হালকা হাতে ঘষে তুলে ফেলুন।
  • নারিকেল তেল ও পেঁপের মিশ্রণ ফাটা গোড়ালিতে লাগিয়ে রাখুন ১৫ মিনিট। এরপর ধুয়ে ফেলুন।
  • সপ্তাহে ২ বার খুব হালকা কুসুম গরম পানিতে চার টেবিল চামচ পুদিনার রস মিশিয়ে পা ডুবিয়ে রাখুন। এতে রক্ত সঞ্চালন ভালো হবে; ফাটা গোড়ালির সমস্যাও দূর হবে।

foot care

ময়েশ্চরাইজিং

শীতের ময়েশ্চরাইরাজের মধ্যে গ্লিসারিন সবচেয়ে ভালো। যেহেতু পায়ের ত্বক ভারী, রাতে ঘুমানোর আগে গ্লিসারিন দিয়ে ঘুমালে পায়ের ত্বক নরম হয় আর ফেটে যাওয়া গোড়ালি সেরে ওঠে। নারকেল বা অলিভ অয়েলও ব্যবহার করা যায়। তবে অলিভ অয়েল ছয় ঘণ্টা পর পর ব্যবহারে বেশি ভালো ফল পাওয়া যায়।

ভেসলিন বা পেট্রোলিয়াম জেলিও ময়েশ্চরাইরাজ হিসেবে খুবই কার্যকর। তবে এটি বেশি ভারী হওয়ায় গ্লিসারিন মিশিয়ে হালকা করে প্রয়োগ করলে ত্বকের ভিতরে সহজে কার্যকর হয়।