সত্যিই দুর্ভাগা উন্নয়নশীল বিশ্ব!

একজন সাবেক সিইসি বলিয়াছেন যে, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক না হইলে নির্বাচন অর্থহীন। আবার বর্তমান সিইসি একটি দলের নাম লইয়া বলিয়াছেন যে, সেই দলটি নির্বাচনে না আসিলে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হইবে না। এইখানে অংশগ্রহণমূলক মানে কী? নির্বাচন কমিশনের কর্মপরিকল্পনায় বলা হইয়াছে, অংশগ্রহণমূলক অর্থ ‘নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক সকল দলের অংশগ্রহণ’। যাহারা অনিচ্ছুক তাহাদের জোরপূর্বক নির্বাচনে আনিবার কোনো বাধ্যবাধকতা আছে কি? নির্বাচনের পূর্বে লক্ষ করা যাইতেছে যে, কোনো কোনো দল বা জোট হইতে বিভিন্ন দফাসংবলিত দাবিদাওয়া উত্থাপন করা হইতেছে। এই দাবিগুলি না মানিলে কি তাহারা নির্বাচনে আসিবেন না? তাহা হইলে স্বাভাবিকভাবে এই প্রশ্নও উঠে, রাজনৈতিক দলগুলি কি এখন ট্রেড ইউনিয়নে পরিণত হইয়াছে? এই দেশে দুইটি প্রধান দল ছাড়া নির্বাচনে অন্য কোনো দলের ৩০০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবার মতো কি আর্থিক সক্ষমতা, কর্মী ও জনবল রহিয়াছে? আর কেহ না চাহিলে তাহাকে নির্বাচনে আনিতেই হইবে কেন?

বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতির অর্থ দাঁড়াইয়া গিয়াছে এই যে, নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করিয়া হইলেও যে করিয়াই হউক, ক্ষমতায় যাইতে হইবে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন লইয়া ক্ষমতায় যাইতে না পারিলে তাহাকে টানিয়া নামাইতে হইবে কেন? ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাহারা দেশ, জনগণ, দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্য, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্থিতিশীলতা ইত্যাদি কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করিতেছেন না। আবার কোনো কোনো দেশে ক্ষমতাসীনদের কথাবার্তা ও আচরণ লক্ষ করিলে মনে হয়, তাহাদের পিছনে যেন কোনো জনসমর্থন নাই। এইখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হইল, যাহারা ক্ষমতায় আছেন বা নাই, তাহারা উভয়েই ভোটারদের ব্যাপারে তেমন গুরুত্ব দেন না। কেননা তাহারা জানেন, ভোটারদের ভোট কিনিয়া লওয়া যায়, ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের ঢুকিতে না দিয়া নির্বাচনকে প্রভাবিত করা যায়। এই সকল উন্নয়নশীল দেশের ভোটারদের অধিকাংশই অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত। ভোট যে একটি পবিত্র আমানত, সেই সম্পর্কে তাহারা সচেতন নহেন। কেহ জোর করিয়া তাহার ভোট দিয়া দিলে সাধারণত ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাহারা তাত্ক্ষণিকভাবে প্রতিবাদমুখর হন না বা হইতে পারেন না।

এই সকল দেশে সংবিধানের বাহিরে গিয়াও দাবি আদায়ের নজির রহিয়াছে ভূরিভূরি; কিন্তু যাহারা দাবিদাওয়ার কথা বলিতেছেন তাহাদের সেই শক্তি কি আছে? আমরা বুঝিতে পারি না ভোটকেন্দ্রে ভোট কাটিয়া লওয়া হয় কীভাবে? কোমরে বা খুঁটিতে জোর থাকিলে কি ইহা সম্ভব? এখন কেহ যদি নির্বাচনে আসিতে না-ই চাহেন, তাহা হইলে আর কী করা যাইবে? যেই সকল সুশীল সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহল বলিতেছেন, তাহাদের আনিতেই হইবে, তাহারা দয়া করিয়া কি সেই উপায়টা বাতলাইয়া দিবেন? তাহারা কি বুকে হাত রাখিয়া বলিতে পারিবেন আমাদের কোন নির্বাচনটা প্রশ্নমুক্ত ছিল? আর বিদ্যমান সিস্টেমের মধ্যে আসিয়া নির্বাচন না করিলে সেই সিস্টেম কীভাবে বদলানো সম্ভব? এই জন্য তাহাদের কি চিন্তাভাবনা করিয়া কথা বলা উচিত নহে? আর এমন লোকেরা নির্বাচন লইয়া নসিহত দিতেছেন যে, যাহারা ইউনিয়ন পর্যায়ে একটি ওয়ার্ডেও কখনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নাই। সেই জন্য আমরা বলিতেছি এবং ভবিষ্যতেও বলিব, এই সকল দেশের ভোটারগণ যতক্ষণ না আর্থিকভাবে সচ্ছল হইবেন, বিশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন না করিবেন এবং ভোটকে একটি পবিত্র আমানত হিসাবে বিবেচনা না করিবেন, ততদিন পর্যন্ত এই সকল দেশে কাঙ্ক্ষিত ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়াটা কঠিন বইকি। আর কেহ ভোট চুরি করিয়া জোরপূর্বক ক্ষমতায় থাকেন কীভাবে? দেশের মানুষ ও প্রশাসন না মানিয়া লইলে তাহারা কেমন করিয়া দেশ পরিচালনা করেন? তাহারা কি ভিনদেশি কেহ?

সেই জন্য যে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য এমনকি অংশগ্রহণমূলক করিতে হইলে সর্বাগ্রে ভোটারদের সচেতন হইতে হইবে। যেই পর্যন্ত না তাহারা সচেতন হইবেন, সেই পর্যন্ত বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচন করাই বাঞ্ছনীয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কি গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন লইয়া প্রশ্ন তুলেন নাই? তাই বলিয়া কি কেহ বলিতেছেন, তাহারা ভবিষ্যতের নির্বাচন বয়কট করিবেন? কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ঠিকই নির্বাচনের পূর্বভাগে নানা সংকট দেখা দিতেছে। নির্বাচনের পূর্বেই অথবা নির্বাচন ছাড়াই কেহ কেহ ক্ষমতার মসনদে যাইতে চাহিতেছেন। সত্যিই দুর্ভাগা উন্নয়নশীল বিশ্ব!