সিলেটে হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিই হয়নি

অতিবৃষ্টি,পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার কবল থেকে বোরোপ্রধান সিলেটের  হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজে এখনো অনেক স্থানে পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) গঠন করা হয়নি। নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বর থেকে ফসল রক্ষা বাঁধের কাজ শুরু ও ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। কিন্তু  পিআইসি গঠনে বিলম্ব হওয়ায় সময়মতো হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে কৃষকরা উদ্বিগ্ন।

এদিকে এখনো বিপজ্জনকভাবে রয়েছে ক্লোজারগুলো। এগুলো গত বন্যায় ভেঙে যায়। কৃষকরা জানান, ক্লোজারের কাজ আগে শুরু না করলে মাটি শক্ত হয় না। বৃষ্টির সময় এগুলো ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকে। জেলার গুরুত্বপূর্ণ ১১৯ ক্লোজারের কাজই শুরু হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী এস এম শহীদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি দ্রুত পিআইসি গঠন করে জানুয়ারির মধ্যেই ভাঙন বন্ধ করে দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনুরোধ জনিয়েছি। পিআইসি গঠিত হলে দ্রুত হাওর রক্ষা কাজ শেষ করা হবে।’

সিলেট বিভাগে সবচেয়ে বেশি বোরো ফসল উত্পাদন হয় সুনামগঞ্জে। ফসলটি প্রতি বছরই ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। এবার এ জেলায় দুই লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এলাকাবাসী জানান, সময়মতো কাজ শুরু ও শেষ না করতে পারলে পাহাড়ি ঢলে ফসলের মাঠ ডুবে যাবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, জেলার ১২ উপজেলা থেকে ৯০৪টি প্রকল্প পাওয়া গেছে। কিছু বাঁধের জরিপ বাকি রয়েছে। তাই আরো কিছু প্রকল্প হতে পারে। চলতি অর্থবছরে ৬২৫ কিলোমিটার বাঁধে কাজ করার লক্ষ্যে ১৭০ কোটি টাকার প্রাক্কলন করা হয়েছে। মাটির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পের বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত রবিবার পর্যন্ত মাত্র ১৪০টি পিআইসি গঠন করা হয়। এদিকে ৫০টি প্রকল্পে মাটির কাজ শুরু হয়েছে। হাওরের পানি নিষ্কাশন হচ্ছে না, তাই অনেক বাঁধে মাটি কাটার মেশিন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে বাঁধের কাজ শুরুতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

এদিকে বাঁধ নির্মাণ, বাস্তবায়নন ও মনিটরিং বিষয়ে গত রবিবার অনুষ্ঠিত মতবিনিময়সভায় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমুল আহসান দ্রুত পিআইসি গঠন করে বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ করার তাগাদা দিয়েছেন।

সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী।

সভায় সচিব নাজমুল আহসান বলেন, আগাম বন্যার পূর্বাভাস ও বাঁধের কাজের  সঠিকভাবে  মনিটরিং করতে হবে। ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি নদী ও খাল খননের বিষয়ে জোর দিতে হবে।

সভায় সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পওর শাখা-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, গত অর্থবছরে সুনামগঞ্জে ৪৮টি হাওরের ৫৩৬ কিলোমিটার বাঁধ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। ৭২৭টি প্রকল্পে ১২৩ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়িত হয়েছিল। কিন্তু এ বছর প্রকল্প এবং বরাদ্দ উভয়ই বেড়েছে।

সভায় বক্তারা বলেন, সময়মতো কাজ শুরু করলে সঠিক সময়ে কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। কিন্তু প্রতি বছরই অসময়ে প্রকল্প গ্রহণের ফলে কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। রাতারাতি কাজ শেষ করতে গিয়ে কাজের গুণমান ভালো হয় না। বাঁধ নির্মাণকাজে শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, বাঁধের কাজের সময় শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু পিআইসি গঠন প্রক্রিয়াই এখনো শেষ হয়নি। পানি নিষ্কাশনের অজুহাতে কাজ শুরু করা যাচ্ছে না বলা হচ্ছে। কিন্তু পানি নিষ্কাশনেরও  বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই। এতে কৃষকের বোরো ফসল ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, চলতি অর্থবছরে বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে। এ পর্যন্ত ২৫ কোটি টাকা ছাড় হয়েছে।