দুর্নীতির ভার বহন করেন কাহারা?

আমাদের দেশে বিখ্যাত একটি বাংলা প্রবাদবাক্য রহিয়াছে। তাহা হইল, ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন’। পশ্চিমবঙ্গে গৌরীকান্ত সেন (১৫৮০-১৬৬৭) নামে একজন ধনাঢ্য ও দানবীর ছিলেন, যিনি কেহ বিপদে পড়িলেই উদারহস্তে দান করিতেন। কেহ কেহ মনে করিয়া থাকেন, ইহা একটি রূপক বা কাল্পনিক চরিত্র। রূপক বা বাস্তব চরিত্র যাহাই হউক না কেন, আধুনিককালে বিশেষত তৃতীয় বিশ্ব বা উন্নয়নশীল দেশসমূহে যেইভাবে দুর্নীতি ও সরকারি অর্থের লুটপাট চলিতেছে, তাহাতে কাহারও তেমন বিবেকের দংশন বা উৎকণ্ঠা লক্ষ করা যাইতেছে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে, রাষ্ট্রীয় অর্থের নয়ছয় হইতেছে তাহাতে কোনো সমস্যা নাই, ‘লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন’। এখানে গৌরী সেন হইলেন আসলে ভুখা-নাঙ্গা, রিকশাওয়ালা, ঠেলাগড়িওয়ালা, নৌকার মাঝি, মুটেমজুর হইতে শুরু করিয়া উঁচুনিচু তলার আমজনতা।

আমরা প্রায়শই দুর্নীতির কথা বলিয়া থাকি; কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখিলে দেখা যায়, এই দুর্নীতিতে রাষ্ট্রের তেমন ক্ষতি হয় না। কেননা, এই দুর্নীতির অর্থ শেষমেশ দিতেছেন সেই আমজনতাই। প্রজেক্টের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িলে তাহাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের কি কোনো ক্ষতি আছে? নাই। যেহেতু সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ কর প্রদানের মাধ্যমে তাহা পরিশোধ করিতেছেন, তাই এই সকল অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে যাহারা দেশ পরিচালনায় থাকেন, তাহাদেরও কোনো মাথাব্যথা নাই। যদি এমন হইত, দুর্নীতির ভার ও ক্ষতিটা দেশের আমজনতা বহন করিতেছেন না, তাহা হইলে তাহাতে আমাদের কোনো আপত্তি ছিল না; কিন্তু সেটা পৃথিবীর কোনো দেশেই  আমরা লক্ষ করিতেছি না।

সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে ইত্তেফাকে একটি সাইন আর্টিক্যাল প্রকাশ করা হইয়াছিল। তাহাতে বলা হইয়াছিল যে, দেশে দুর্নীতি নাই, এমনকি পৃথিবীতেও নাই। অথচ রাস্তায় হাঁটিলেই গায়ে গায়ে দুর্নীতিবাজদের সহিত ধাক্কা লাগে। এখন তো তাহারা গলার নিকট আসিয়া পাড়া দিতেছে। বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হইয়াছিল, তখন ৯৯ শতাংশ লোকের কোনো টিআইএন নম্বর ছিল না। সেই বাঙালিরা এখন ব্যাংক হইতে ৩০ হাজার কোটি টাকারও অধিক লইয়া যাইতেছে। ব্যাংকাররা এখন জিজ্ঞাসা করিতেছেন, ঋণের টাকা ফিরত দিলে কত ‘উপরি’ দিবেন আর ফিরত না দিলে দিবেন কত ‘উপরি’? ইহা চিন্তার বিষয়ই বটে। যে কোনো ব্যাপারে একটা সীমা-পরিসীমা থাকা উচিত; কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল বিশ্বে আমরা সেই সীমা ক্রমেই ছাড়াইয়া যাইতেছি। উপরি বা ঘুষ এখন আমাদের মজ্জাগত, শ্বাস-প্রশ্বাসের সহিত জড়িত। এমন অভিজ্ঞতাও বিরল নহে যে, কোনো এক দেশের বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশনের লোক জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘দাদা, সিগারেট আছে?’ ভদ্রলোক প্যাকেট বাহির করিয়া সিগারেট দিতেই তৎক্ষণাৎ বলা হইল, ‘দাদা প্যাকেটটাই রেখে যান না’।

আমাদের বক্তব্য হইল, দুর্নীতির অর্থ শেষ অবধি আমজনতাই পরিশোধ করিয়া থাকেন; কিন্তু তাহারা তাহাদের ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে নির্বাক ও নিশ্চুপ। কবি লিখিয়াছেন, ‘বিচারপতি, তোমার বিচার করবে যারা/ আজ জেগেছে এই জনতা।’ এই লেখা বহু পূর্বের। আজ তিনি বাঁচিয়া থাকিলে কী লিখিতেন, তাহা আমাদের জানা নাই। কাহারও জানা থাকিলে তাহা আমাদের জানাইবেন। যেই দেশে সরকারের নিকটই লক্ষ-হাজার কোটি টাকা বকেয়া পড়িয়া রহিয়াছে, সেই দেশে বেসরকারি খাত হইতে বকেয়া আদায় করা কতটা দুরূহ হইতে পারে, তাহা ভাবিয়া দেখিতে হইবে। যেই দেশে মানি লন্ডারিংয়ে সরকার ও সরকারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত থাকিবার খবর প্রকাশিত হয়, সেইখানে মানি লন্ডারিং বন্ধ হইবে কীভাবে? এইখানে নীতি-নৈতিকতারও তো প্রশ্ন রহিয়াছে।

আমরা গতকাল লিখিয়াছি, রাজনীতিবিদেরা যেন চোর, ডাকাত, খুনি, মদ্যপ ইত্যাদি। কেননা, তাহাদের চরিত্র হননের জন্যই এমন সকল অভিযোগ দায়ের করা হয়। সেই সকল রাজনীতিবিদ যখন আবার দেশ পরিচালনায় আসেন, তখন জনমনে কি প্রশ্ন দেখা দেওয়াটা স্বাভাবিক নহে? তাহারা কেন মুরগি চুরির মতো অপরাধে জেল খাটিবেন? রাজনীতিবিদেরাই যখন দেশ পরিচালনা করিবেন, তাহা হইলে এত সাজাইয়া-গুছাইয়া তাহাদের দুর্নীতিবাজ বানাইলে কাহারা উপকৃত হইবেন, সেই প্রশ্নও থাকিয়া যায়। ইহা ছাড়া যে দেশে বিনা বিচারে রাষ্ট্র হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে, সেই দেশে কেন একজন ফাঁসির কাষ্টে ঝুলিবেন বা যাবজ্জীবন জেল খাটিবেন? এই সকল প্রশ্ন আজ মানুষের মনে জাগিয়া উঠিতেছে। ভবিষ্যতে শিক্ষার হার যতই বাড়িবে, ততই মানুষ সচেতন হইবে। তখন যাহারা রাজনীতি করিতে আসিবেন, তাহারা এই সকল প্রশ্নের উত্তর জানিয়া-শুনিয়াই আসিবেন বলিয়া আমরা আশা রাখি।