স্বাধীনতার পাঁচ দশকে বাংলাদেশে অন্যান্য সেক্টরের মতো স্বাস্থ্য খাতেও দৃষ্টিগ্রাহ্য অনেক উন্নয়ন হইয়াছে। পূর্বে বিভিন্ন জটিল চিকিৎসার জন্য মানুষ ছিল রাজধানী ঢাকার উপর নির্ভরশীল। এখন জেলা-উপজেলায় অনেক উন্নত মানের স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়িয়া উঠিয়াছে। আজ বেসরকারি খাতেও স্বাস্থ্যসেবা বিকশিত হইয়াছে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে আমাদের ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিবিচ্যুতি এখনো রহিয়া গিয়াছে। সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই বিভিন্ন সংকট বিদ্যমান। বর্তমানে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা লইয়া দোটানায় পড়িয়াছে। অনেকে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা নিতে পারিতেছে না ব্যয়বহুল হইবার কারণে। সেইখানে আস্থার সংকটও রহিয়াছে। অন্য দিকে সরকারি খাতে মিসম্যানেজমেন্ট এমন পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে যে, সেইখানে চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়া হয়রানি ও ভোগান্তির শিকার হইতে হয় পদে পদে।
আজ একটি দৃষ্টান্ত দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হইয়া যাইবে। গতকাল ইত্তেফাকে একটি খবর প্রকাশিত হইয়াছে এই মর্মে যে, খুলনায় শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালেও আজ মিলিতেছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। কারণ বৎসরের পর বৎসর ধরিয়া সেইখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক মেশিন ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বিকল ও অচল হইয়া পড়িয়া রহিয়াছে। যেমন ব্রেন টিউমার অপারেশনের জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় করা অপারেটিভ মাইক্রোস্কপ অব নিউরো সার্জারি মেশিনটি এখনো ইনস্টলই করা হয় নাই। রেডিওলজি বিভাগের একটি এমআরআই মেশিন ও একটি সিটি স্ক্যান মেশিন বহুদিন ধরিয়া অকেজো অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে। হার্টের রোগীদের জন্য একটি এক্সারসাইজ টলারেন্স টেস্ট (ইটিটি) মেশিনও প্রায় দুই বৎসর ধরিয়া নষ্ট। একটি ক্যাথল্যাব ও একটি এনজিওগ্রাম মেশিনও অকেজো। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলিতেছে যে, তাহারা এই ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করিয়াছে। কিন্তু কোনো ফলোদয় হইতেছে না। এমনকি নিউরো সার্জন মেশিনটি যাহাতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝাইয়া দেয়, এই জন্য ১১ বার অনুরোধপত্র বা রিমাইন্ডার দেওয়া হইয়াছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পর্যন্ত অন্যান্য অকেজো মেশিনের ব্যাপারে চিঠি প্রদান করা হইয়াছে। কিন্তু তাহাতেও কোনো কাজ হইতেছে না বলিয়া জানা যায়। ইহাতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত এই সরকারি হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হইতেছে, প্রতিদিন তৈরি হইতেছে বিশৃঙ্খলা এবং মানুষ টেস্ট না করিয়াই চলিয়া যাইতেছে।
একটি বিভাগীয় শহরের সবচাইতে বড় হাসপাতালটির এই দৈন্যদশা দেখিয়া আমরা বিস্মিত হইয়া গেলাম। জেলা-উপজেলা শহরের সদর হাসপাতালের অনেক সমস্যার কথা আমরা প্রায়শই লিখিয়া থাকি। কিন্তু একটি বিভাগীয় শহরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালেও কেন এতগুলি মেশিন অচল অবস্থায় পড়িয়া থাকিবে? সেইখানকার জেলা সিভিল সার্জন এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় পরিচালক, স্বাস্থ্য তাহলে কীজন্য রহিয়াছেন? ঢাকায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যেই সকল দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রহিয়াছেন, তাহারা কি সারা দেশের এমন স্বাস্থ্যসেবার সংকট দেখিতে পান না? তাহারা কি কুম্ভকর্ণের মতো কেবল ঘুমাইয়াই থাকিবেন? আর সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা না পাইয়া হতাশ মনে কেবল ফিরিয়াই যাইতে থাকিবে? এমন তো নহে যে, সরকার স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দ দিতেছে না। অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার পরও যদি সরকারি খাতে অর্থ জোগানদাতা সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সেবা না পায়, তাহলে তাহার দায় কাহার?
সরকারি হাসপাতালে মেশিন দেওয়া হইয়াছে, অথচ তাহা পড়িয়া থাকিবে, লোকবলের অভাবে চালু বা মেরামত করা যাইবে না কিংবা বিদ্যুতের অভাবে কানেকশন দেওয়া যাইবে না ইত্যাদি অভিযোগ আমরা আর শুনিতে চাহি না। আমরা কী অসুবিধা ও মুসিবতের মধ্যে আছি, তাহা একটি এক্সরে মেশিনের জন্য তদবির করিতে দেখিয়াও তাহা সম্যক উপলব্ধি করা যায়। অতএব, দেশের প্রধান নির্বাহীর চাইতে তাহার অধীনস্থ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করিতেছেন, সেটাই আজ বিবেচ্য ও চিন্তার বিষয়।