চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবসহ নানা কারণে বিশ্ব জুড়িয়াই দেখা দিয়াছে মূল্যস্ফীতি। উন্নয়নশীল দেশের মানুষ নানাভাবে এই মূল্যস্ফীতির চাপে দিশাহারা। বিশেষ করিয়া, চিকিৎসা ব্যয় দিন দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। এই ব্যয় মিটাইতে গিয়া মানুষ আর্থিক বিপর্যয়ে পড়িতেছে। কথায় বলে, সারা অঙ্গে ব্যথা, ঔষধ দিব কোথা? খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রেও এই সকল দেশের মানুষ চাহিদা মিটাইবার ক্ষেত্রে হিমশিম খাইতেছে। সেই ক্ষেত্রে চিকিৎসার ব্যয় লইয়া আলাদাভাবে বলিবার কারণ কী? আসলে গভীরভাবে ভাবিলে দেখা যায়, বিশেষ করিয়া আমাদের দেশে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় বাড়াইবার বদলে কমানো হইতেছে, যাহা অপ্রত্যাশিত। এই খাতে অর্থবরাদ্দের সদ্ব্যবহার ও ঔষধের মূল্য কমানোর সুযোগ থাকিলেও আমরা সেই ব্যাপারে কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করিতেছি না। সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে তদারকি ও নজরদারিও কম।

বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের তিন-চতুর্থাংশ বহন করিতেছে ব্যক্তি নিজেই। এই পরিসংখ্যান দিয়াছে খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট। তাহারা বলিতেছে, ২০১৮, ২০১৯ ও ২০২০ সালে স্বাস্থ্য ব্যয়ে সরকারের অংশ ছিল যথাক্রমে ২৮, ২৬ ও ২৩ শতাংশ। ইহাতে বুঝা যায়, সরকারের অংশ ক্রমান্বয়ে কমিয়া যাইতেছে। এই সময়ে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ছিল যথাক্রমে ৬৪, ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ। অবশ্য করোনাকালীন সরকারের স্বাস্থ্য ব্যয় কেমন ছিল, তাহা একটি প্রশ্ন। এই সময় সরকারের ব্যয় বৃদ্ধি পাইবারই কথা। তাহার পরও চিকিৎসার মতো খাতে কোনো পরিস্থিতিতে বরাদ্দ কমানো কাম্য নহে। বর্তমানে পথেঘাটে ও বিভিন্ন পরিবহনে এমন অনেক রোগীকে মানুষের নিকট হাত পাতিতে দেখা যায়, যাহারা জটিল চিকিৎসার খরচ মিটাইতে না পারিয়া বাধ্য হইয়া পথে নামিয়াছে। এমপি-মন্ত্রীসহ সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের দ্বারে দ্বারে গিয়াও তাহাদের ধরনা দিতে দেখা যায়। ক্যানসার, পক্ষাঘাত, হার্ট, কিডনি ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা করিতে গিয়া অনেকে শেষ সম্বল জমি বা ভিটা বিক্রয় করিয়া থাকে। এই সকল চিকিৎসার পিছনে খরচ করিতে গিয়া অনেকে নিঃস্ব হইয়া যাইতেছে। গত বৎসরের শেষের দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক বৈশ্বিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় মিটাইতে গিয়া ২৪ শতাংশ মানুষ বিপর্যয়মূলক ব্যয়ের মুখে পড়ে। চিকিৎসা নিতে গিয়া প্রতি বৎসর ৬২ লক্ষাধিক মানুষ নিপতিত হইতেছেন দারিদ্র্যসীমার নিচে। আর ১৬ শতাংশ খানা চিকিৎসা নেওয়া হইতে বিরত থাকিতেছে।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য খাতে সরকার ও অন্যান্য অংশীদারের (যেমন—উন্নয়ন সহযোগী, ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান, এনজিও প্রভৃতি) বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। দেখা যায়, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ চলিয়া যায় ঔষধের পিছনে। বাকি অর্থ ব্যয় হয় ডায়াগনসিস বা রোগনির্ণয়, ডাক্তারের ভিজিট, হাসপাতালে ভর্তি এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেবা খাতে। আমাদের ঔষধশিল্প একটি বিকাশমান শিল্প এবং আমরা এখন বিদেশে ঔষধ রপ্তানিও করিয়া থাকি। কিন্তু দেশে ঔষধের মূল্য এত অধিক হইবে কেন? এই জন্য ঔষধ কোম্পানিগুলির আগ্রাসী বিপণননীতি পরিহার করা প্রয়োজন। যথাসম্ভব দামি মোড়ক ব্যবহার না করা, চিকিৎসকদের অনৈতিকভাবে উপহারসামগ্রী না দেওয়া ইত্যাদি নানা উপায়ে আমরা ঔষধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে আনিতে পারি। বিশেষত অত্যাবশ্যকীয় ঔষধের মূল্য মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তথা নাগালের মধ্যে রাখিতে পারি। ইহা ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিভাগ বা অঞ্চলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমরা যে বৈষম্য দেখিতে পাই তাহারও অবসান একান্ত কাম্য। একই সঙ্গে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ও শিক্ষায় রোগপ্রতিরোধের চাইতে প্রতিকার ও জনসচেতনতাকে প্রাধান্য দিতে হইবে, যাহাতে রোগেরই সৃষ্টি না হয় এবং গড়িয়া তুলিতে না হয় অতিরিক্ত স্বাস্থ্য অবকাঠামো। এই ব্যাপারে সুচিন্তিত পদক্ষেপ নিতে পারিলে জনগণের উপর হইতে স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ কিছুটা হইলেও কমানো যাইতে পারে।