‘তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ?’

স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের এই দিনে বঙ্গবন্ধু যদি আবার ফিরিয়া আসেন এই বদ্বীপে তাহা হইলে কী দেখিবেন তিনি? কী প্রশ্ন জাগিবে তাহার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথের মতো কি তিনি পুনরায় বলিবেন—কবিগুরু তুমি ভুল বলো নাই, আমরা এখনো পুরাপুরি মানুষ হই নাই। তাহার মনে কি প্রশ্ন জাগিবে—‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছ অপমান,/ অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান!’ ইহার পর কি তিনি ভাবিবেন—‘যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো,/ তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো।’ জানি না বঙ্গবন্ধু ক্ষমা করিবেন কি না। তিনি কি মহামতি যিশুর মতো তাহার হত্যাকারীদের ব্যাপারে ভাবিবেন—‘হে ঈশ্বর, তুমি ইহাদের ক্ষমা করো, তাহারা জানে না তাহারা কী করিতেছে।’

ষাটের দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লিংকন মেমোরিয়ালে আড়াই লক্ষ মানুষের সামনে মার্টিন লুথার কিং শুনাইয়াছিলেন এমন একটি স্বপ্নের কথা, যাহাকে বলা হয় অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবমুক্তির কবিতা—আই হ্যাভ এ ড্রিম। মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ‘স্বপ্ন’ ছিল। দেশভাগের পূর্বে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়িবার সময় হইতেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো মুজিবও ‘স্বপ্ন’ দেখিয়াছিলেন একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার; কিন্তু ১৯৪৭ সালে তাহা হয় নাই। অতঃপর পাকিস্তানের অংশ হইয়া শোষণ ও বঞ্চনার বিপরীতে বঙ্গবন্ধু ক্রমশ হইয়া উঠিলেন অদ্বিতীয় ক্যারিশম্যাটিক নেতা। তাহার রাজনৈতিক পথযাত্রা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। একটি জাতির স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র অর্জনের জন্য মাত্র ৫৫ বৎসরের জীবনে তিনি কারাভোগ করিয়াছেন ৪ হাজার ৬৮২ দিন! বলা হইয়া থাকে, রাজনীতি করিতে গেলে ডিগবাজি নাকি খাইতেই হয়; কিন্তু তিনি কখনো ডিগবাজি খান নাই। তিনি কখনো তাহার আদর্শ হইতে বিচ্যুত হন নাই। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করিল বটে; কিন্তু পোড়ামাটি নীতির মাধ্যমে পাকিস্তান একাত্তরে এই দেশটিকে ধ্বংস্তূপে পরিণত করিয়াছিল। সেই ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়াইয়াও তিনি বিপুল ও ব্যাপক সীমাবদ্ধতার মধ্যে বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের কাঠামো তৈরিতে কোনো আপস করেন নাই। বিজয়ের মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য ফেরত পাঠাইলেন তিনি। বাহাত্তরেই তিনি প্রণয়ন করিলেন একটি নূতন সংবিধান, নূতন নির্বাচন দিলেন পরের বৎসর। দেশে তখন সীমাহীন অভাব, সীমাবদ্ধতার শেষ নাই। তিনি নিজের বেতন করিলেন মাত্র এক টাকা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কমাইলেন, বলিলেন যে, দেশ গড়িয়া তুলিতে সকলে মিলিয়া কষ্ট ও অভাব ভাগ করিয়া লইতে হইবে। এইভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় আমরা তাহাকে একজন মানবিক রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে দেখিতে পাই। জাতীয়করণ কর্মসূচি, কৃষিক্ষেত্রে পদক্ষেপ, অর্থনৈতিক সংস্কার, সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগে পুনর্নির্মাণ, ড. মুহাম্মদ কুদরাত-এ-খুদার মাধ্যমে নূতন শিক্ষানীতি, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে গৃহীত পদক্ষেপ, কৃষকের জন্য সার ও কৃষি উপকরণ বিতরণ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা, বেতার ও টেলিভিশনে আজান চালুকরণ, পরিত্যক্ত ব্যাংক-বিমা ও শিল্পকারখানা রাষ্ট্রায়ত্তকরণ, স্বল্পসময়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি ও সদস্যপদ লাভ—তাহার এই সকল বিবিধ অর্জনের মূলে রহিয়াছে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো গঠনের প্রচেষ্টা।

বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রগঠনের জন্য তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিষ্ঠার সহিত চেষ্টা করিয়াছিলেন বিধায় তাহার অনেক শত্রুও সৃষ্টি হইয়াছিল; কিন্তু তাহাতে তিনি পিছপা হন নাই। এমনকি তিনি দলের বড় বড় নেতার সহিত দ্বিমত পোষণ করিয়া হইলেও ওআইসিতে গিয়াছিলেন। তিনি বিশ্বাস করিতেন, দেশকে গড়িতে হইলে সকলকে লইয়াই কাজ করিতে হইবে। এই জন্য তাহার প্রধান শর্ত ছিল যে, যাহারা শরিক হইবেন, তাহাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখিতে হইবে। প্রকৃতপক্ষে, স্বাধীনতার ফল তিনি সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাইয়া দিতে চাহিয়াছিলেন। নিজের ব্যাপারে আত্মবিশ্লেষণে তিনি বলিয়াছেন যে, ‘তোরা আমার সমালোচনা করবি, বলবি—আমি তেমন দেশ চালাইতে পারি না—কিন্তু আমি যে তোদের একটি পাসপোর্ট দিয়া গেলাম, তা কি অস্বীকার করতে পারবি?’ যথার্থ অর্থেই আন্তর্জাতিক আসনে বাংলাদেশকে আসীন করিয়া গিয়াছেন তিনি। এখন তিনি পুনরায় আসিয়া এই দেশকে যদি দেখিতে পাইতেন, তাহা হইলে কী ভাবিতেন? নিঃসন্দেহে তাহার অনুভূতি হইত টক-ঝাল-মিষ্টির মতো মিশ্র। গত অর্ধশতাধিক বৎসরে বাংলাদেশে চোখে পড়িবার মতো উন্নয়ন হইয়াছে বটে; কিন্তু ইহার সহিত তৈরি হইয়াছে লুটেরা ও দুর্নীতিবাজ একটি শ্রেণি। নানাবিধ রাষ্ট্রীয় অপচয়ে বঙ্গবন্ধু নিশ্চয়ই কষ্ট পাইতেন। তিনি জনগণের অর্থের অপচয় পছন্দ করিতেন না; কিন্তু তাহার নীতিগত সেই অপচয়ের বজ  আঁটুনি এখন অনেক শিথিল হইয়া গিয়াছে।

বঙ্গবন্ধু বলিয়াছেন, ‘আমার ধারণা হয়েছিল মানুষকে ভালোবাসলে মানুষও ভালোবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্যে জীবন দিতেও পারে।’ যদিও তাহাকে হত্যার শিকার হইতে হইয়াছিল। বঙ্গবন্ধুকে যাহারা হত্যা করিয়াছে, তাহারা বঙ্গবন্ধুর নশ্বর দেহটিকে প্রাণহীন করিয়াছে মাত্র, তাহার আদর্শ ও নীতিকে হত্যা করিতে পারে নাই। যত দিন পর্যন্ত এই অপূর্ব পলিমাটিবিধৌত দেশটি মহাকালের বুকে বিরাজিত থাকিবে—ততদিন অবধি বঙ্গবন্ধুর অর্জনকে খাটো বা অস্বীকার করিবার কোনো সুযোগ নাই—ইহা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।