আমাদের কৃষি: অর্থনীতির আগামী চ্যালেঞ্জ

আমাদের কৃষি ও কৃষক অর্থনীতির প্রাণ বা প্রধান চালিকাশক্তি। এ কথা স্বীকার করে আমরা হয়তো আমাদের দায় এড়াতে পারি, কিন্তু যে কৃষিকে নিয়ে আমাদের এত গর্ব তাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার যে কর্মপন্থা আমাদের নেওয়া দরকার ছিল তার কার্যকর উদ্যোগ এখনো আমরা নিতে পারিনি। আজ খাদ্য উৎপাদনে যে বিপ্লব আমরা দেখতে পাচ্ছি তার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ব্রিটিশ শাসনামল এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও আমাদের প্রধান খাদ্যবস্তু চালের সিংহভাগ ছিল আমদানি নির্ভর। বর্তমানে আমাদের খাদ্যের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে গেলেও আমরা অনেকটাই স্বয়ংসম্পন্ন। এই সার্থকতার মূল নায়ক হলো আমাদের কৃষক। আর নেপথ্যে কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদানও বিশাল।

কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদনের হার বৃদ্ধি এবং উৎপাদিত দ্রব্যের প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণে চাই বিশ্বমানের নীতি। উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের কৃষকদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক অনাগ্রহ। নতুন প্রযুক্তির বিস্তার ও প্রয়োগে কৃষিবিদদের প্রচেষ্টা অব্যাহত। কিন্তু সনাতন নিয়মের বাইরে তারা যেতে চায় না। তাদের অজ্ঞতা এবং বিশ্ব জলবায়ুর পরিবর্তন সঙ্গে মানিয়ে নিতে কৃষকরা সবসময়ই থাকেন নানা সমস্যা ও বিড়ম্বনায়। আমাদের অপরিণামদর্শী কর্মফলেই কৃষি নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এখনো শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং মোট জিডিপির ২২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। তাই কৃষি উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটলে দেশের সামাজিক অর্থনীতি বিপন্ন হবে।

জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। রাস্তাঘাট, মিল-কারখানা, অপরিকল্পিত বাড়িঘর ইত্যাদি অবকাঠামো তৈরিতে চাষযোগ্য জমি থেকে প্রতিদিন ২২০ হেক্টর হিসেবে প্রতিবছর হারিয়ে যাচ্ছে প্রায় ৮০,৩০০ হেক্টর জমি। আবাদি জমিতে বাড়ছে পুকুর ও ডেইরি খামার। বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য পাল্লা দিয়ে নিবিড়ভাবে চাষ করা হচ্ছে ধান আর ধান। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ধানের সঙ্গে আনুপাতিক হারে অন্যান্য ফসলের (ডাল, তেল, শাকসবজি, ফলমূল) চাষ আশানুরূপ বাড়েনি। খাদ্য নিরাপত্তার প্রথম এবং প্রধান শর্তই হচ্ছে খাদ্য জোগানের সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা থাকা অর্থাৎ নিশ্চিত আয়ের সংস্থান থাকা, যার দ্বারা সবাই চাহিদা ও পছন্দ মতো নিরাপদ এবং প্রয়োজনীয় আমিষসহ পুষ্টিকর খাবার সংগ্রহ করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বর্তমানে বছরে ৮০ লাখ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়। সংরক্ষণের অভাবে উল্লেখযোগ্য অংশ নষ্ট হয়ে যায়। পৃথিবীর অনেক দেশ যেমন ডেনমার্ক, হল্যান্ড, ব্রাজিলের জনগণ প্রধান খাদ্য হিসেবে আলু খেয়ে থাকে। আমরা ১০০ গ্রাম চালের পরিবর্তে আলুসহ অন্যান্য সবজি ও ফল খাদ্যতালিকায় প্রতিস্থাপন করতে পারলে চালের ওপর অনেকাংশে চাপ কমবে। আর এজন্য প্রয়োজন  সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিকতা এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন।

মাটির স্বাস্থ্য নির্ভর করে মাটির মধ্যে বিদ্যমান পানি, বায়ু আর জৈব উপাদানের ওপর। আর এসব নির্ভর করছে মাটির নিচে বসবাসরত অণুজীব সমষ্টির ওপর। অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার, বালাইনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে এ অনুজীব ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। শুধু মাটির অনুজীব বা মাটির স্বাস্থ্য নয়, ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্যসহ পরিবেশ। ফসলের জমিতে ক্রমাগত আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্বরতা হ্রাসসহ ফসলের ফলন কমে যাচ্ছে। নিবিড় ফসল ও ফলচাষে ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক সার। মাটির প্রাণ হচ্ছে জৈবসার। জৈব পদার্থ হারিয়ে মাটি অনুর্বর ও অনুত্পাদনশীল হয়ে পড়ছে। জমির আদর্শ খাদ্য হলো গোবর সার, দেশের অনেক এলাকায় এই আদর্শ গোবর সার জমিতে প্রয়োগের পরিবর্তে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডেনমার্কসহ অনেক উন্নত দেশে মাটির জৈব পদার্থ সংরক্ষণের জন্য জমিতে গোবর সার ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বলা হয় ‘সবার আগে জৈব সার তারপর অন্য সার’। আমরা চলছি উলটোপথে। অপরিকল্পিত বালাইনাশক ব্যবহারে পোকা-মাকড়, রোগ-বালাইয়ের প্রাকৃতিক শত্রু, বন্ধু পোকা ধ্বংস হচ্ছে। শত্রু পোকার বালাইনাশক সহনশীলতা বাড়ছে।

ভালো ফসল উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হচ্ছে বীজ। ভালো বীজের বিকল্প নাই। কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, একই ব্যবস্থাপনায় শুধু মানসম্পন্ন ভালো বীজ ব্যবহারের মাধ্যমে ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বর্ধিত ফলন পাওয়া সম্ভব।

কৃষি উদ্যোক্তা, ফরিদপুর