লেখকের ভাবনা বইয়ের আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে

একুশের বইমেলা এখন বাঙালির জীবনের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। শুধু সৌন্দর্যে বিন্যাসে নয়, এই বইমেলা প্রাচুর্যময় ও পরিশীলিত হয়ে উঠেছে আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে। এই মেলা এমন বিশাল বিপুল বৈচিত্র্যময় ছিল না, খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে নিতান্ত সামান্য অবস্থার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এ বইমেলা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই। ১৯৭২ সালে। মুক্তধারার কর্ণধার চিত্তরঞ্জন সাহা ছিলেন প্রথম বইমেলার উদ্যোক্তা। তারই উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় একুশের বইমেলার সূচনা। এখন সেই বইমেলা এক বিশাল জনসমুদ্র। রমনার আকাশ বইয়ের প্রচ্ছদের আলোকে ঝলসিত, লাবণ্যময়। মন ভরে যায়। আমি এই মেলার কথা যখন ভাবি, তখন মনে-প্রাণে গৌরব বোধ করি। পৃথিবীতে আরো অনেক বিখ্যাত বইমেলা আছে, সেগুলোর দুই-একটি আমি নিজের চোখেও দেখেছি। কিন্তু বাঙালির জীবনের একুশের বইমেলার মতো আর কোথাও এমন বইমেলা নেই। এ তো শুধু বইমেলা নয় বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসব, অক্ষরের বিচিত্র কারুকার্যে ভরা, মাসব্যাপী আনন্দের কেন্দ্র। আমার প্রত্যাশা—এই মেলা বাঙালির বুদ্ধি মেধা ও চিন্তার প্রসার ঘটাতে আরো মননশীল হয়ে উঠুক। জ্ঞানচর্চায় বিদ্যা আহরণে কাব্যচিন্তায় মানবিক সংস্কৃতির অনুশীলনে আরো উদ্বুদ্ধ করুক আমাদের। আমি আরো অনেক কিছু পেতে আশা করি এই মেলার কাছ থেকে, আরো আলো, আরো উজ্জ্বলতা, আরো মানবিক সৌন্দর্যবোধ; বিশ্বে এই মেলা হয়ে উঠুক অনন্য অদ্বিতীয় ও একক।

এই মেলার সঙ্গে বলা যায় আমার প্রাণের সম্পর্ক। এই মেলার সূচনাপর্ব থেকে বহু বছর প্রতিদিন মেলার নিয়মিত দর্শক ছিলাম আমি, সারা মেলা ঘুরে বেরিয়েছি বন্ধুজনদের সঙ্গে, ভাববিনিময় করেছি, কত নতুন নতুন পাঠকদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, নবীনদের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরেছি—সে এক অভূতপূর্ব আনন্দ। এখন মেলায় আমি আর উপস্থিত হতে পারি না। কিন্তু পয়লা ফেব্রুয়ারি থেকে মেলার শেষ প্রহর পর্যন্ত আমার মন পড়ে থাকে মেলায়। মেলার কলরোল, সুরতরঙ্গ আমার কানে বাজে। আমি মুগ্ধ হই। মেলায় না যেতে পারলেও আমার সারা মন ভরে থাকে মেলা। আমি মেলার অক্ষরের সৌন্দর্যে ভরা আকাশখানি দেখতে পাই। বাংলা অক্ষর যেন তারা হয়ে ফুটে আছে আকাশময়। তবে, কাগজের দুর্মূল্য এবার প্রকাশনা শিল্পের একটি বড় সংকট সৃষ্টি করেছে। বই প্রকাশে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এই সংকটের মধ্য দিয়েও আমাদের প্রকাশকেরা নতুন নতুন প্রকাশনার মধ্য দিয়ে বইমেলাকে সমৃদ্ধময় করার চেষ্টা করেছেন। তবুও আমার প্রত্যাশা—বই বাঙালির জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠুক, বন্ধু হয়ে উঠুক। একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের যে চিন্তার জগত খুলে দিয়েছে, বাংলা ভাষাকে ভালোবাসার প্রথম প্রেরণা দিয়েছে, বাঙালির আত্মপরিচয় উদ্ঘাটিত করেছে—তা যেন আমরা ভুলে না যাই। একুশের শিক্ষা, একুশের আলো, একুশের প্রেরণা আমাদের মনুষ্যত্বের শিক্ষা দান করুক। আমরা পরিপূর্ণ হয়ে উঠি বিকশিত হয়ে উঠি প্রস্ফুটিত হয়ে উঠি—এই আশা আমি প্রাণের গভীরে লালন করি। মেলায় না যেতে পেরেও আমি মেলায় আছি। মেলার কলধ্বনি শুনতে পাচ্ছি।

বাংলাদেশ এখন এক বিপুল সম্ভাবনার দেশ। এখন তার পদ্মা সেতু মেট্রো রেল—দেশব্যাপী পথমালা প্রসারিত। বঙ্গবন্ধুর যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলা ক্রমেই সেই সোনার বাংলা হয়ে উঠছে। পূর্ণ হয়ে উঠছে সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে প্রাচুর্যময় হয়ে উঠছে। এই সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে আমরা যেন একটি আধুনিক মানবিক উন্নত সমাজ গড়ে তোলার অবিরাম প্রয়াসে নিয়োজিত হই। আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি, ৭ই মার্চ, মুক্তিযুদ্ধ, পয়লা বৈশাখ এক বিপুল প্রাণশক্তিতে নিয়ত আমাদের জীবন ভরে তুলছে। আমরা ক্রমেই আরো এগিয়ে যাব। বাংলাদেশ বাংলা ভাষা বাঙালি জাতি পৃথিবীতে এখন গৌরবের অধিকারী। একুশ দেশে দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা রূপে পালিত হয়। বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি প্রাচুর্য এখন পৃথিবীময় প্রসারিত।

বাংলাদেশ বাংলা ভাষা ও বাঙালির জয় হোক।    

লেখক: কবি