আমি এক স্বপ্নহীন মেয়ে ছিলাম। কারণ, নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ হওয়ার স্বপ্ন দেখার সাহস ছিল না কখনো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন জীবনে কিছু করতে হবে এমন ভাবনা আসলো তখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। আমার স্বপ্নগুলো সময় অতিক্রমের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে। কে জানতো- স্বপ্নহীন এই মেয়েটির জন্য ঈশ্বর চাওয়ার চেয়ে অনেক বড় পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন। গল্পটি তানিয়া আক্তারের। ১৫তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় সহকারী জজ বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছে তিনি।
পারিবারিক টানাপোড়েনের মধ্যে বেড়ে ওঠা এক সাহসী মেয়ে নেত্রকোনা জেলা সদরের মদনপুর ইউনিয়নের একটি অজপাড়াগাঁয়ে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম তানিয়া আক্তারের। কৃষক বাবার মেয়ে হয়ে বড় স্বপ্ন দেখা তার কাছে আকাশ কুসুম মনে হত। ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ারতো বহু দূরের ভাবনা, যখন সে হাইস্কুলে পড়তেন তখন তার ভাবনা ছিল মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারবে কিনা তাই ছিল অনিশ্চিত। কিন্তু ভালো ফলাফল করতে থাকায় তার আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে। মদনপুর শাহ সুলতান হাইস্কুল থেকে ২০১২ সালে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন শাহ সুলতান ডিগ্রি কলেজে।
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি যুদ্ধের মাধ্যমে ভর্তি হয় ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের (২০১৫-২০১৬)শিক্ষাবর্ষে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা করার সময়েই বিচারক হবে এই স্বপ্নের অঙ্কোরোদম হয় তার।
তানিয়া বলেন, আল্লাহ যখন আমাকে আইনে পড়ার সুযোগ করে দিল তখন থেকেই আমার বাবা, মা, আমার বড় বোন জামাই/ কাজিন, বড় আপু, বড় ভাই সবাই চাইতেন আমি যেন জজ হই। আর আমার প্রিয়জনের স্বপ্নপূরনে আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম। কত নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি এই স্বপ্নপূরন করে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাবো।
তবে, স্বপ্ন পূরণের পথটা আমার জন্য খুব সহজ ছিল না। তবে আমার পরিবার নিজের ক্ষমতার বাহিরে এসেও আমার স্বপ্নপুরনে আমার পাশে ছিল। আমার জীবনে শিক্ষকদের ভূমিকা অনেক, আমাকে তারা স্বপ্ন পূরণের পথ দেখিয়েছে। অনেক কঠিন সময়ে আমাকে সাহস দিয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগ আমার ২য় পরিবার। এই পরিবারের অভিভাবক শ্রদ্ধেয় স্যাররা আমার পথ প্রদর্শক। আমাকে মানসিক, লজিক সাপোর্ট দিয়ে আমার স্বপ্ন পূরণে সাহস যুগিয়েছে। তাদের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা। আমার বন্ধুবান্ধবদের অনেক ধন্যবাদ জানাই।
আমি ঈশাঁ খা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা মহান পেশায় যুক্ত হওয়াটাও আমার জন্য ছিল অনেক বড় প্রাপ্তি। আমি যখন স্কুল, কলেজে পড়ি তখন ভাবতাম হয়ত স্কুল, কলেজের শিক্ষক হব। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি তখন দুইটা স্বপ্নের উদয় হয় হয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব, না হয় বিচারক। তবে আমার পরিবার চাইতেন আমি বিচারক হই। আমার কৃষক বাবা বিচারকের বাবা হতে চেয়েছিলেন। তাই বাবা, পরিবারের স্বপ্নপূরনের পথে হেঁটেছি। আলহামদুলিল্লাহ আমার পরিবারের স্বপ্ন পূরনে আল্লাহ সহায় হয়েছেন। আল্লাহ যেহেতু আমাকে বিচারক হওয়ার তৌফিক দান করেছেন। আমি এই বিচারিক দায়িত্বটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কাজ করব।