লেখার মৌলিকত্ব দিয়েই পাঠক ধরে রাখতে হবে: সাদাত হোসাইন

নানান প্রতিকূলতায় এবারের গ্রন্থমেলা, মেলায় নতুন বই, আধুনিকতায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কাগজের বই পড়া থেকে পাঠকের দূরে সরে যাওয়া, লেখালেখির প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং লেখক হিসেবে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির এমন সব বিষয় নিয়েই ইত্তেফাক অনলাইনের মুখোমুখি হয়েছিলেন জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইনের। 

এবারের বই মেলায় নতুন বই কয়টি? 

দু’টি উপন্যাস আসছে। একটি ‘শঙ্খচূড়’ অন্য প্রকাশ থেকে। আর অন্যটি ‘সে এসে বসুক পাশে’ এটি আসছে অন্যধারা থেকে।

বই পড়ার প্রতি পাঠকের অনীহা, প্রকাশনীগুলোর পিছপা এবং এত শঙ্কার মধ্যেও এবারের বইমেলা নিয়ে আপনার প্রত্যাশা কী?

‘শঙ্কা তো রয়েছেই, গত দুই বছর বৈশ্বিকভাবেই মহামারিসহ নানা কারণে একটা অস্থিরতা চলছে। সেই অস্থিরতা স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশনা শিল্পের ওপরও পড়েছে। পাঠক তাদের দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর পর বই পড়ার কথা ভাববে তাই না? সুতরাং সেই শঙ্কার কারণেই সবার মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, এবারের বইমেলায় সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। বাংলাদেশের প্রকাশকরা মূলত সারা বছর বইমেলার ওপর নির্ভর করে থাকেন। এতগুলো শঙ্কার পরেও দিন শেষে আমরা বিশ্বাস করি পাঠকরা বই ভালোবাসেন, তারা সব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বইয়ের কাছে আসবেই।’ 

বর্তমানে পাঠক কাগজের বই পড়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

‘আগে একজন লেখক খুব সহজে তার বই প্রকাশের কথা পাঠককে জানাতে পারতেন না। যেটা শুধুমাত্র জনপ্রিয় লেখকের পক্ষে সম্ভব ছিল। কারণ তাদের প্রকাশকরা বিজ্ঞাপন বাবদ বিনিয়োগ করতেন। তাই নতুন লেখকদের বইয়ের প্রচারণাটা বেশ কঠিন ছিল। বর্তমানে প্রত্যেকের কাছে ব্যক্তিগত ডিভাইস, ডোমেইন বা একাউন্ট ইত্যাদি থাকে। আর বইয়ের প্রচার বা পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দিতে এসব ডিভাইস খুব জরুরি। যদি বইয়ের প্রচারটা সর্বোচ্চ উপায়ে করা সম্ভব হয় সেসব  মাধ্যমে তাহলে পাঠককে বইয়ের কাছে নিয়ে আসাও সহজ হবে। মানে অনেকটা কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতো ব্যাপার। এসব ডিভাইসের কারণে পাঠক যেমন বই থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছি আমরা। ঠিক তেমনি এই ডিভাইসগুলোর মাধ্যমেই বইয়ের কাছে তাদের নিয়ে আসা সম্ভব’।

সাদাত হোসাইন।

আপনার লেখা পাঠককে কখনো হাসায় আবার কখনো কাঁদায়। কতোটা তৃপ্তি পান আপনি? 

‘রবীন্দ্রনাথের একটি গানের লাইন ‘আমার মন কেমন করে’। এই যে মন কেমন করে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না বলে উনি একটা এমন একটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেখানে তার প্রশ্নের মধ্যেই উত্তর আছে। কিন্তু সেটা বোঝাতে পারছে না। বোঝতে পারলেও প্রকাশ করতে পারছে না। এটাই হচ্ছে সম্ভবত প্রেমের একটা সার্বজনীন অনুভূতি। কিছু অনুভূতি আছে দুঃখ পাওয়ার। যেমন আমরা কষ্ট পেলে কাঁদি সেগুলো আসলে সার্বজনীন। কিন্তু কতটুকু কষ্ট পেলে কাঁদি সেটা গুরুত্বপূর্ণ। আপনি একজন পাঠককে তখনই কাঁদাতে পারবেন যখন আপনি তার ভেতরে আপনার লেখনী দিয়ে ঠিক ওই অনুভূতি ট্রান্সলেট করতে পারবেন। অর্থাৎ কতটুকু কষ্ট পেলে সে কাঁদবে। আমার মনে হয় একজন লেখক হিসেবে আমি খুব সংবেদনশীল। এই সংবেদনশীলতা আমি আমার লেখার শব্দ, বাক্য বর্ণনার মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারি। আমি আমার চারপাশের ঘটনাগুলোকে খুব অন্তরঙ্গভাবে প্রকাশ করতে পারি। এই কারণে আমি কোনো আনন্দের ঘটনায় হাসি সেটি আমি যতোটা তীব্রভাবে অনুভব করি ঠিক ততোটা তীব্রভাবে প্রকাশ করতে পারি। আর এ কারণেই পাঠক সেটি দ্বারা স্পর্শিত হতে পেরে হাসে। অন্যদিকে দুঃখের বিষয়টাতে ঠিক একই রকম’।

লেখালেখি আসলে কতোটুকু নিশ্চয়তা তৈরি করতে পারছে?

‘যারা এ কথাটি বলেন তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার জায়গায়। প্রতিটি ঘটনাকে দেখার অনেকগুলো দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। লেখালেখিতে বাংলাদেশে তো ওই ধরনের সুযোগ নেই। হাতে গোনা কয়েকজন যেমন- হুমায়ুন আহমেদ স্যারকে দেখেছি যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। এছাড়া বেশিরভাগ লেখকই লেখালেখির পাশাপাশি জীবন ধারণের জন্য কিছু করতেন বা করছেন। বাংলাদেশে পাঠকসংখ্যাও কম। সেই কারণে বই বিক্রিও কম হবে। এজন্য লেখকও গুরুত্ব পাবে না বলে মনে করি। লেখক যদি গুরুত্ব না পান তাহলে তার জীবন-জীবিকা চলবে কীভাবে? তার তো একটা পরিবার আছে, অতএব আমাদের দেশের পাঠকদের সংখ্যা কম হওয়ায় আর্থসামাজিক যে বাস্তবতা সেদিক থেকে আমাদের অভিভাবকদের এমন মন্তব্য ঠিকই আছে বলে মনে করি। আমরা যদি আমাদের ভাবনা নিয়ে লিখতে পারি অর্থনৈতিক চিন্তা করার দরকার নেই, সে ক্ষেত্রে আবার এ প্রশ্ন অপ্রয়োজনীয়।’

স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করেছেন, সিনেমায় আপনার লেখা গান তৈরি হচ্ছে। এটা নিয়ে বড় কোনো পরিকল্পনা কি আছে?

‘সিনেমা তৈরিতে যে পরিমাণ সময় ও শ্রম দেওয়া দরকার আমি আসলে সেটা দেওয়ার জন্য এই মুহূর্তে প্রস্তুত না। আমার মনে হয় সেটা আমার লেখালেখির সময়কে কেড়ে নেয়। তবে সামনে সিনেমা বানানো, এটা আমার অনেক বড় স্বপ্ন। গানের ব্যাপার হচ্ছে আমিতো আসলে কবিতা লিখি। আমার যে কোনো কবিতা দিয়েই গান বানানো সম্ভব। অনেকেই আমার কবিতা দিয়ে গান করতে চাই। কিন্তু কেউ চাইলেই তো আর দেওয়া যায় না। সে কাকে দিয়ে সুর করাবে, গাওয়াবেন এবং কোন প্লাটফর্মে ব্যবহার করবেন। সেটা আমার পছন্দ হতে হবে। আমি যে অনেক গান লিখতে চাই বা যে কেউ চাইবে তাকে দিতে হবে তেমন না। আমার ভাবনা প্রত্যাশার সাথে যে মেলাতে পারবে তার জন্য হয়তো গান লিখবো বা আমার কবিতা গুলো দিয়ে গান করতে দিবো। আর নাটক, সিনেমা বা ওয়েবে কাজ করতে আমি আগ্রহী কিন্তু আমার প্রত্যাশা অনুযায়ী হতে হবে।

সাদাত হোসাইন।

একজন লেখকের কোন কোন বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত বলে মনে করেন?

‘পাঠক ধরে রাখার সার্বজনীন কোনো নিয়ম নেই। প্রত্যেক লেখককে তার চিন্তা, ভাবনার মৌলিকত্বটাকে বজায় রেখে ওই মৌলিকত্ব দিয়েই পাঠককে ধরে রাখার ক্ষেত্রে মনোযোগী হওয়া উচিত। আমি মনে করি একজন লেখকের চারটি বড় সক্ষমতা বা দক্ষতার জায়গা হওয়া উচিত। সেটি হলে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটা ভালো থাকতে হবে, সংবেদনশীল হতে হবে, প্রচুর পড়তে হবে ও প্রকাশ করতে জানতে হবে। একজন লেখক তার লেখা দিয়ে তখনই পাঠককে স্পর্শ করতে পারবেন যখন সে পাঠকের একটি বিশেষ ঘটনাকে গভীরভাবে অনুভব করতে পারবেন। ধরুন একজনের হাত আগুনে পুড়ে গেছে। আগুনে পুড়ে যাওয়ার সেই কষ্টটা সব মানুষের একই রকম অনুভব হবে। কিন্তু আপনি যখন লিখবেন তখন সে সেটিকে কীভাবে বর্ণনা করবে? এই বর্ণনার জন্যই ভাষা দরকার, ভাষার জন্য প্রচুর পড়াশোনার দরকার।

সংবেদনশীলতা হলো সেটা অনুভব করতে পেরেছে কীভাবে, পর্যবেক্ষণ হলো আগুনে পুড়ে যাওয়া সকলের কষ্ট এক হলেও কেউ ভীতিকর কিছু দেখলে সেই ভয়ের মাত্রাটা কিন্তু এক নাও হতে পারে। আসলে সবার শরীর দিয়ে স্পর্শ করার বিষয়টি একই রকম হয় কিন্তু যেটি মন দিয়ে অনুভব করার বিষয় কিন্তু সবার এক নাও হতে পারে। তখন একজন লেখককে তার পর্যবেক্ষণ শক্তি ব্যবহার করতে হবে। যে তার চারপাশের মানুষ কোনো ঘটনায় কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটা যখন তার থাকবে তখন এই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাটাকে সে নিজের ভেতর আত্মস্থ করতে পারবে তার সংবেদনশীলতা দিয়ে বা পর্যবেক্ষণ করার পর অনুভব দিয়ে সেই পর্যবেক্ষণটাকে অনুবাদ করবে এবং তখন তার যে ভাষা জ্ঞান তা ব্যবহার করে সেটিকে প্রকাশ করবে। তখনই মানুষকে স্পর্শ করবে। লেখকের পর্যবেক্ষণ, অনুভব, প্রকাশের ক্ষমতা এটি কিন্তু প্রত্যেক লেখকের আলাদা আর এখানেই লেখক এর মৌলিকতা।