গতকাল ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি সংবাদ শিরোনাম হইল—‘চমেক ছাত্রাবাসে টর্চার সেল’। স্বাধীন বাংলাদেশে ‘টর্চার সেল’ থাকিবে কেন? ইহার নাম শুনিয়াই আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হইয়া গেল। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে টর্চার সেল গড়িয়া উঠিবার কথা আমরা জানি। সেই সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের উপর অহরহ জুলুম-নির্যাতন চালাইত। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও নাগরিকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করা এইরূপ সেলের অস্তিত্ব থাকাটা কি অপ্রত্যাশিত ও উদ্বেগজনক নহে? স্বাধীনতার আরেক অর্থ হইল, ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার তথা ভয়ের সংস্কৃতি হইতে নাগরিকদের মুক্ত রাখা; কিন্তু টর্চার সেলের মাধ্যমে মানুষ নির্যাতিত হইবে—এমন দেশ মুক্তিযোদ্ধারা কখনোই কামনা করেন নাই। ইহা আসলে কীসের আলামত?
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের মতো সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত বৎসরের অক্টোবর মাসে এক শিক্ষার্থীকে লোহার রড দিয়া পিটাইয়া মাথার হাড় ভাঙিয়া দেওয়া হয়। তাহার মাথায় আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের লইয়া গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড দীর্ঘদিন ধরিয়া তাহাকে চিকিৎসা প্রদান করে। এই ঘটনাটি সমগ্র দেশে তুমুল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ইহার রেশ এখনো কাটে নাই। তাহার মধ্যেই আবার চার শিক্ষার্থীকে টর্চার সেলে নিয়া পাইপ, স্টাম্প ও লাঠি দিয়া পিটাইয়া শরীর থ্যাঁতলাইয়া দেওয়া হইয়াছে। এই সভ্য যুগে এই সকল কী অসভ্যতা? কোনো শিক্ষার্থী কি তাহার কোনো সহপাঠী বা একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীর উপর এইভাবে বর্বরোচিত পন্থায় হামলা চালাইতে পারে? এই নিষ্ঠুরতার শিক্ষা তাহারা কোথা হইতে পাইল? মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা মানুষের শরীর ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ লইয়া লেখাপড়া করে। তাহাদের হৃদয়ে তো বেশি করিয়া দয়ামায়া ও মানবতা জাগ্রত হইবার কথা; কিন্তু তাহাদের কেহ কেহ সীমারের মতো এত নিষ্ঠুর হইতে পারে কীভাবে? আহতদের মধ্যে দুই জনের অবস্থা গুরুতর। তাহাদের ইতিমধ্যে চমেক হাসপতালের আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হইতেছে। বাকি দুই জনকে চিকিৎসা লওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় নাই বলিয়া অভিযোগ উঠিয়াছে। সেই ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়ক বলিয়াছেন যে, হামলার শিকার চার জনই বৈধ ছাত্র। যদি তাহারা বৈধ ছাত্র হইয়া থাকেন, তাহা হইলে তাহাদের রক্ষা করিতে না পারিবার দায় তিনি কিংবা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ কেন দায় নিবেন না? সেইখানে দিনের পর দিন টর্চার সেলের অস্তিত্ব থাকে কীভাবে?
গত ১০ বৎসরে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে সরকারসমর্থক ছাত্র সংগঠন ছাড়া অন্য কোনো ছাত্র সংগঠনের প্রকাশ্য তৎপরতা নাই। তাহার পরও সেই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির বিবদমান দুই গ্রুপ ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করিয়া একের পর এক কেলেঙ্কারির জন্ম দিতেছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করিতেছে। কী তাহাদের স্বার্থ? তাহাদের স্বার্থ হইল ক্যাম্পাসে নির্মাণকাজের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের কেনাকাটায় টেন্ডার বাগানো, রোগী পরিবহনের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স লইয়া চাঁদাবাজি, ওয়ার্ডে রোগীদের ঔষধ ক্রয়ের স্লিপ নিয়ন্ত্রণ, হাসপাতালের আশপাশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি। একটি সংগঠন বা দল পরিচালনার জন্য একটি সুশৃঙ্খল কর্মীবাহিনী একান্ত প্রয়োজন। শুধু সরকারি দলই নহে, সকল দলই নিজেদের স্বার্থে এমন একটি চৌকশ কর্মীবাহিনীর প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে যাহারা যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করিতে সক্ষম। তাহাদের ক্যাডার বা মাস্তান যাহাই বলা হউক না কেন, তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইহা এক রুঢ় বাস্তবতা; কিন্তু অন্তর্দ্বন্দ্ব বা কোন্দল এমনই এক ভয়ংকর বিষয়, যাহা নিজ সংগঠনকেই তিলে তিলে ধ্বংস করিয়া ফেলে। এই ক্ষেত্রে তাৎকক্ষণিক ও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নাই। ইহা ছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে র্যাগ ডের নামে এবং গেস্ট বা টিভিরুমে ডাকিয়া আনিয়া শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন চালাইবার যে অপসংস্কৃতি রহিয়াছে তাহার অবসান একান্ত কাম্য। গণরুমে থাকা শিক্ষার্থীদের যেইভাবে হয়রানি করা হয়, তাহাও বন্ধ হওয়া দরকার।