আজ আমরা কিছুটা ব্যতিক্রমী বক্তব্যের অবতারণা করিতে চাই। এই ধরনের কথাবার্তা অনেকেই মনে মনে বলেন; কিন্তু প্রকাশ্যে বলিতে চাহেন না। কারণ প্রকাশ্যে বলিলে তাহা ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদি পরিপন্থি বলিয়া গণ্য হইতে পারে। সুশীল সমাজ, কবি-সাহিত্যিক, চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহল দেশের বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করিয়া থাকেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হইবার পর সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে সর্বহারাদের উত্থান, একসময় জেএমবির বাংলা ভাইদের সন্ত্রাস, একই রকমের ১৪-১৫টি দলের অস্তিত্ব, উগ্রপন্থি বিভিন্ন গ্রুপের অপতত্পরতা ইত্যাদি ছিল চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশের বয়স এখন ৫১ বৎসর। এই ৫১ বৎসরে যাহারা দেশ পরিচালনায় আসিয়াছেন, তাহাদের মনঃপীড়া ও অসহায়ত্ব ছিল এই সকল শক্তির উত্থানের কারণে। তাহার মধ্যে ঘরপোড়ার মধ্যে আলুপোড়া খাওয়া লোকের অভাব ছিল না। ছিল মুনাফাখোর ও মজুতদারদের দৌরাত্ম্য। একসময় আমাদের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সক্ষমতারও অভাব ছিল। এই পরিস্থিতিতে বিশেষত প্রথম দিকে যাহারা দেশ পরিচালনা করিয়াছেন তাহাদের কেহ কেহ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পদত্যাগেরও উদ্যোগ লইয়াছিলেন। এই দেশে শহিদ মিনারের মতো জায়গায় নারী লাঞ্ছিত হইবার ঘটনাও ঘটিয়াছে। ইহার পাশাপাশি ছিল বিদেশি ষড়যন্ত্র। এমনকি ঐ সমস্ত শক্তির তৎপরতাও ছিল, যাহারা নানা অঘটনে পটিয়সী। এতকিছুর পরও যৎসামান্য হইলেও দেশের কল্যাণে কিছু করিবার চেষ্টা সকলেই করিয়া গিয়াছেন।
ইহারই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান আল্লাহর অসীম রহমতে ক্ষমতারোহণ করেন। প্রথম পাঁচ বৎসর তিনিও ছিলেন নানা টানাপড়েনে; কিন্তু তাহার এই ১৪ বৎসরের শাসনামলে যে কেহ স্বীকার করিবেন যে, আজকে বাংলাদেশের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম, গ্রাম-গঞ্জ, শহর-নগর, জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যন্ত সর্বত্র অকল্পনীয় ও অবর্ণনীয় পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে। যাহারা এই ৫১ বৎসর যাবৎ বাংলাদেশকে দেখিতেছেন, তাহাদের পর্যবেক্ষণেও ইহা ধরা পড়িতেছে। যদি বিশ্বে যুদ্ধবিগ্রহ না চলিত, তাহা হইলে বাংলাদেশের রূপ কী হইত তাহা কি কেহ একবার গভীরভাবে চিন্তা করিয়া দেখিয়াছেন? যে কোনো সরকারের বিরুদ্ধে আলোচনা-সমালোচনা থাকিবেই। যেই সকল দেশে সম্পদের অভাব নাই, সেই সকল দেশেও যাহারা ক্ষমতায় থাকেন, তাহাদের সমালোচনা হয়। সমালোচনা হয় মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থানের প্রত্যাশিত হার, এমনকি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও বয়স লইয়া। সেই তুলনায় উন্নয়নশীল বিশ্ব যাহারা পরিচালনা করিতেছেন, তাহাদের সমস্যার অন্ত নাই। পাহাড়সম প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যাহারা এই সকল দেশ পরিচালনা করিতেছেন, তাহারা কি একটু সহানুভূতি পাইতে পারেন না? ভুপেন হাজারিকার সেই কালজয়ী গানের মুখ বা আস্থায়ীর মতো ‘মানুষ মানুষের জন্য/ জীবন জীবনের জন্য/ একটু সহানুভূতি কি/ মানুষ পেতে পারে না...’
আমরা জানি—পরিবর্তন, উন্নয়ন কিংবা জীবনমানের কোনো শেষ নাই। তবে গত কয়েক দশকের যে পরিবর্তন তাহা কি শুধু একশ্রেণির মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রহিয়াছে? বিজ্ঞজনেরা বলেন, আয়ব্যয়ের পার্থক্য বা বৈষম্য বাড়িয়া গিয়াছে। অথচ আজ খাসজমির সদ্ব্যবহারের চেষ্টা চলিতেছে নানাভাবে। স্বাধীনতার পর শুরুতে দরিদ্র, ভূমিহীন ও ছিন্নমূল মানুষদের বাড়ির জন্য ঢেউটিন বিতরণ করা হইত। আর এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাহাদের জমি প্রদানপূর্বক ঘর নির্মাণ করিয়া একটি ঠিকানা গড়িয়া দিতেছেন। এই পৃথিবীতে কেহই চিরদিন বাঁচিয়া থাকিবেন না। তবে এই সকল সুকীর্তি অবশ্যই চিরকাল বাঁচিয়া থাকিবে।
একটি আধাসামন্তবাদী রাষ্ট্রে জনকল্যাণে কাজ করিতে গেলে নানা ঝড়ঝঞ্ঝা ও বাধাবিপত্তি আসিয়া থাকে। যাহারা মাঠ প্রশাসনে কাজ করেন, তাহারা ইহা ভালো করিয়াই জানেন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাহার ছাড়পত্র কবিতায় লিখিয়াছেন, ‘চলে যাব—তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ/ প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল’। এই দেশেও সরকারপ্রধান একইভাবে সকল বাধা ও জঞ্জাল সরাইয়া অগ্রসর হইতেছেন। বিশেষ করিয়া, গত প্রায় দেড় দশকে দেশের যেই ব্যাপক আর্থসামাজিক উন্নয়ন হইয়াছে তাহা দেখিয়া অবাক হইতে হয়। সুকান্ত তাহার ‘অনুভব’ কবিতার শুরুতে লিখিয়াছেন, ‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি’। একইভাবে আমরা বর্তমান সরকার প্রধানের উদ্দেশে বলিতে পারি, অবাক বাংলাদেশ! অবাক করিলে তুমি।