আমরা বাল্যশিক্ষায় অনেক নীতিকথা রপ্ত করিয়াছি; কিন্তু বাস্তব জীবনে আসিয়া অনেক ক্ষেত্রে দেখিতেছি এই বিশ্বসংসার চলিতেছে উলটাপথে। ঠিক নচিকেতার সেই বিখ্যাত গানের মতো—‘কোনো এক উলটো রাজা উলটো বুঝলি প্রজার দেশে/ চলে সব উলটো পথে, উলটো রথে, উলটো বেশে।’ ছোট্টকালে আমরা শিখিয়াছি, অনেস্টি ইজ দ্য বেস্ট পলিসি। অর্থাৎ সততাই উত্তম পন্থা; কিন্তু আজ দেখিতেছি, সৎ ব্যক্তিদের নির্বোধ এবং অসৎ ব্যক্তিদের চতুর ও বুদ্ধিমান হিসাবে আখ্যায়িত করা হইতেছে। অনেক সময় আমরা চাহিলেও সৎ থাকিতে পারিতেছি না; কিন্তু আমরা কেন সৎ থাকিতে পারিতেছি না তাহা কি একবার গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিয়াছি?
সততা মানবচরিত্রের শ্রেষ্ঠ গুণ হইলেও আমাদের সমাজে আজ ইহার বড়ই অভাব। অথচ এই পৃথিবীতে আজ সৎ ও ভালো মানুষ হওয়াটাই কি সবচাইতে জরুরি নহে? মানুষ সৎ হইলে সমাজ ও সংসার হইয়া উঠিবে আলো ও শান্তিময়; কিন্তু আমাদের সমাজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাইয়া গিয়াছে যে, সিস্টেম বা পদ্ধতিগত কারণে মানুষ অনেক সময় চাহিলেও সৎ থাকিতে পারিতেছে না। চারিপাশের পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে সততার পরিচয় দিতে পারিতেছে না। প্রথমত আমাদের আয়ব্যয়ের সহিত সামঞ্জস্য না থাকিবার কারণে আমরা শেষপর্যন্ত অসৎ হইতে বাধ্য হইতেছি। কথায় আছে, কাট ইওর কোর্ট অ্যাকোরডিং টু ইওর ক্লোথ তথা আয় বুঝিয়া ব্যয় কর; কিন্তু আমরা অনেক সময় এতটাই অপচয়-অপব্যয় করি যে, আল্লাহর বাণী অনুযায়ী শেষপর্যন্ত শয়তানের ভাইয়ে পরিণত হই। আর শয়তানের পাল্লায় পড়িয়া আমরা শেষপর্যন্ত সৎ থাকিতে পারি না। দ্বিতীয়ত হিংসা-বিদ্বেষের কারণে আমরা সৎ থাকিতে পারি না। অনেকে বলেন, ‘পরশ্রীকাতরতা’ শব্দটি শুধু বাংলা ভাষায় রহিয়াছে। আল্লাহ আমাকে যতটুকু নিয়ামত দিয়াছেন তাহা লইয়া আমাদের সন্তুষ্ট থাকা প্রয়োজন; কিন্তু আমরা প্রতিবেশীসহ অন্য লোকের ধন-সম্পদের দিকে তাকাইয়া থাকি। অথচ আল্লাহ তায়াআলা বলিয়াছেন, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যাহা দিয়াছেন, সেই জন্য কি তাহারা তাহাদের ঈর্ষা করে?’ (সূরা আন-নিসা-৫৪)। ইহা এমন এক ভয়ানক ব্যাধি যাহা মানুষের ‘পুণ্যগুলি খাইয়া ফেলে যেইভাবে আগুন লাকড়িকে জ্বালাইয়া নিঃশেষ করিয়া দেয়।’ (আবু দাউদ)। তৃতীয়ত আমাদের মধ্যে অল্পে সন্তুষ্টি নাই। সীমিত সম্পদের মধ্যেও একটু একটু করিয়া সঞ্চয়ের মাধ্যমে ভালো ও সৎ থাকা যায়। ইহাতে অপূর্ণতায় কোনো আক্ষেপ থাকে না। এই জন্য ইসলামে এইরূপ ব্যক্তিকে বলা হইয়াছে সৌভাগ্যবান।
চতুর্থত দুর্নীতিবাজ বা অসৎ হইবার কুমন্ত্রণা প্রথমে আসে পরিবার হইতে। পরিবারের আপনজনরা যখন উপার্জনকারী ব্যক্তিদের হেয় ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করিতে শুরু করে এবং কথায় কথায় গঞ্জনা দেয়, তখন অনেকে অসৎ পথে পা বাড়াইতে বাধ্য হন। এই জন্য যাবতীয় হীন মনমানসিকতা, সম্পদের মোহ, পদমর্যাদার লোভ-লালসা, শঠতা-কপটতা ইত্যাদি হইতে আমাদের দূরে থাকিতে হইবে। ব্যবসায়-বাণিজ্যসহ যাবতীয় লেনদেন ও কাজকর্মে আমাদের সততার পরিচয় দিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, এই সততাই আমাদের জীবনের সৌন্দর্য ও সম্মানের প্রতীক। ইহা ছাড়া কাহারো প্রতি আস্থা রাখা যায় না। দেশে যেই হারে কালোবাজারি, অবৈধ মুনাফাখোর, দুর্নীতিবাজ, অর্থ পাচারকারী ও অসাধু লোকের সংখ্যা বাড়িতেছে, সেইখানে সততার গুণটি আমাদের নিকট ক্রমেই মহামূল্যবান হইয়া উঠিতেছে। আরবিতে একটি প্রবাদ রহিয়াছে, আসসিদকু ইউনজি ওয়াল কিজবু য়ুহলিকু অর্থাৎ সত্য পরিত্রাণ দেয়, মিথ্যা ধ্বংস ডাকিয়া আনে। অতএব, মহান আল্লাহ মানবসমাজকে যে সীমারেখায় চলিতে নির্দেশ দিয়াছেন, সেই অনুযায়ী সৎ ও স্বচ্ছ থাকিয়া জীবনযাপন করিতে হইবে। এই সততাই হইল সকল সুখ-শান্তি ও উন্নতির ভিত্তিমূল। তাই প্রশান্তিময় জীবন লাভ করিতে হইলে সততা ও সত্যবাদিতা অবলম্বনের কোনো বিকল্প নাই।