সবারই মন খারাপ থাকে, তাই বলে সবাই কিন্তু ডিপ্রেস না, কেননা মন খারাপ লাগা আর ডিপ্রেশনে ভোগা এক নয়। বর্তমানে অনেকের মন খারাপ হলেই বিষণ্ণতায় আক্রান্ত বলে মনে করে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়েও সেটাকে মনখারাপ বলে গুরুত্ব দেন না এবং চিকিৎসা নিতে চান না। আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন নিচের ৯টি লক্ষণের মধ্যে অন্তত পাঁচটি লক্ষণ টানা দুই সপ্তাহ বা তার বেশি সময়ে থাকলে মনে করা হয় যে, সে ব্যক্তি ডিপ্রেশনে আক্রান্ত। লক্ষণগুলো হলো :১. দিনের বেশির ভাগ সময় মন খারাপ থাকে; ২. কাজকর্মে আনন্দ ও আগ্রহ কমে যাওয়া; ৩. অস্বাভাবিকভাবে ঘুম কমতে বা বাড়তে পারে; ৪. খাবারের রুচি কমতে বা বাড়তে পারে; ৫. প্রায় খুব অস্থিরতা বা একদম চুপচাপ হয়ে পড়া; ৬. প্রায় প্রতিদিন ক্লান্তি বোধ করা বা শক্তি হারিয়ে ফেলা অনুভব করা; ৭. প্রায় প্রতিদিন নিজেকে অপরাধী বা মূল্যহীন বা দায়ী মনে করা; ৮. প্রায় প্রতিদিন সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা অথবা চিন্তা বা মনোযোগের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলা; ৯. ক্রমাগত মৃত্যুচিন্তা কিংবা আত্মহত্যার চিন্তা বা আত্মহত্যার প্ল্যান বা আত্মহত্যার চেষ্টা করা।
তবে মন খারাপ ও বিষণ্ণতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। সেগুলো হলো : ১. মনখারাপ একটি স্বাভাবিক আবেগ, অন্যদিকে বিষণ্ণতা একটি আবেগজনিত মানসিক রোগ; ২. মনখারাপ বা স্যাডনেস বিষণ্ণতার একটা লক্ষণের সঙ্গে আরো কয়েকটি লক্ষণ (সব মিলে কমপক্ষে পাঁচটি) থাকলে তাকে বিষণ্ণতা বলা হয়; ৩. বেশির ভাগ মানুষের জীবনে কোনো না কোনো সময়ে মনখারাপ হয় :কিন্তু অল্প কিছু মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ বিষণ্ণতায় আক্রান্ত (জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট-২০১৯); ৪. মনখারাপ সাধারণত অল্প কিছুদিন থাকে, এটা ক্ষণস্থায়ী। অন্যদিকে বিষণ্ণতা দীর্ঘদিন অর্থাৎ ১৪ দিন বা তার বেশি সময় থাকে; ৫. বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মন খারাপের কারণ জানা যায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিষণ্ণতার কারণ জানা যায় না; ৬. মন খারাপের সময় শারীরিক লক্ষণ থাকে না। কিন্তু বিষণ্ণতায় শারীরিক লক্ষণ থাকে (যেমন :খাবার রুচির বেশি বা কম, ঘুমের পরিমাণ বেশি বা কম ইত্যাদি); ৭. মন খারাপের সময় কাজকর্মের আগ্রহ কিছুটা থাকে। এই সময় প্রিয়কাজ করতে ভালো লাগে। তবে বিষণ্ণতায় কাজকর্ম করার আগ্রহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়; ৮. বিষণ্ণতার জন্য সাইকোথেরাপি বা মেডিসিন বা কোনো কোনো সময়ে দুই চিকিৎসারই প্রয়োজন হয়; কিন্তু মন খারাপের জন্য সাধারণত চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না।
বিষণ্ণতার ভয়াবহতার দিক রয়েছে। এটি শুধু মানসিক অসুখ নয়, নানা শারীরিক জটিল সমস্যার মূল কারণ হিসেবে কাজ করে। বিষণ্ণতার কারণে দীর্ঘদিন ক্ষুধামন্দা ভাবের ফলে শরীর অপুষ্টি হতে পারে, মেয়েদের পিরিয়ড অনিয়মিত হতে পারে, পাকস্থলীর এসিডি বৃদ্ধি পেয়ে জটিল আকার ধারণ করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বড় সংকট সৃষ্টি করবে এই মানসিক ব্যাধিটি।
ডিপ্রেশনের চিকিৎসা দুই ধরনের। যথা :১. মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা; ২. সাইকোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা। ডিপ্রেশনের পরিমাণ খুব বেশি হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে হয়। ডিপ্রেশনের মাত্রা কমিয়ে সাইকোলজিক্যাল থেরাপি শুরু করতে হয়। ডিপ্রেশনের মাত্রা একটু কম হলে শুধু সাইকোলজিক্যাল থেরাপি দিয়েই চিকিৎসা করা সম্ভব। সাইকোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসায় সাইকোলজিস্টদের প্রথম কাজ হলো আগের অভিজ্ঞতা, বর্তমান মেইনটেইনিং ফ্যাক্টরের মধ্যে কগনিশন, বিহেভিয়ার, মোটিভেশন, মুড ও শারীরিক সমস্যা ইত্যাদি অ্যাসেসমেন্ট করতে হয়। এই সময় প্রতি সপ্তাহে একটা করে সেশন নিতে হয়। সাইকোলজিক্যাল থেরাপিতে হোম ওয়ার্ক না করলে চিকিৎসায় তেমন কোনো ফলাফল পাওয়া যায় না।
বিষণ্ণ ব্যক্তিকে পরিবার থেকে আলাদা না করে সবার মধ্যে রেখে তার প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে, যাতে তিনি কোনোভাবেই হীনম্মন্যতায় না ভোগেন। ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কখনো রাগারাগি বকাবকি বা সমালোচনা করা যাবে না। বরং মাঝে মাঝে প্রশংসা ও ছোট ছোট ভালো আচরণের জন্য পুরস্কৃত করতে হবে। তাকে অলস অকর্মণ্য বলা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ডিপ্রেশনের জন্যই তিনি কাজকর্মে আগ্রহ পাচ্ছেন না। বিষণ্ণতায় আক্রান্ত ব্যক্তির অতীতের পজিটিভ ঘটনাগুলো লিখতে উত্সাহিত করুন, কে কে তাকে ভালোবাসে তার তালিকা করতে বলতে পারেন, কী কারণে তাকে তারা ভালোবাসে তা বের করলে, কিছু পজিটিভ চিন্তা আসবে। তাকে সঙ্গে নিয়ে কিছু হালকা ব্যায়াম করা যেতে পারে। প্রয়োজনে প্রিয়জনকে কোনো মনোবিজ্ঞানী বা মনোচিকিত্সকের কাছে সেশন নিতে উত্সাহিত করতে পারেন। এই সময়ে অনলাইনেও সেবা পাবেন। তবে আত্মহত্যার চিন্তা বা সংকেত থাকলে তাকে দ্রুত বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসায় আগ্রহী করে তুলুন, এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তিও লাগতে পারে।
লেখক : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট