মানবসভ্যতা টিকিয়া আছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়মতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের খুঁটির উপর ভর করিয়া। জগতের সকল কিছুর ভিতরেই রহিয়াছে এক আশ্চর্য ভারসাম্য। ইহাই শৃঙ্খলা, ইহাই নিয়ম, ইহাই প্রকৃতির আইন। রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বড় বড় প্রতিষ্ঠানের ভিতরেও থাকে এই শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা। কারণ, যে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়িয়াই উঠে উহার অন্তর্নিহিত শক্তির দ্বারা। এই কারণে প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলা যেমন খুব সহজ কাজ নহে, তেমনি কোনো শক্ত প্রতিষ্ঠানকে রাতারাতি ধসাইয়াও দেওয়া যায় না। আসলে জগতে আইনকানুন আছে এই কারণে যে, যাহাতে অনিয়ম বিশৃঙ্খলায় কোনো জনপদ বসবাস অনুপযুক্ত হইয়া না পড়ে; কিন্তু সমস্যা হইল, উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলিতে এখনো আধা-সামন্তবাদী মানসিকতা দূর হয় নাই। এই সকল বিষয় লইয়া যাহারা গবেষণা করেন, তাহারা মনে করেন, বহু যুগ ধরিয়া উন্নয়নশীল বিশ্বের সমাজ গড়িয়া উঠিয়াছে একধরনের নৈরাজ্যের ভিতর দিয়া। এই জন্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে একটি জাতির নিয়মতান্ত্রিক সুষ্ঠু বিকাশধারার জন্য তৈরিকৃত প্রতিষ্ঠানের জন্য যতই বলা হউক—‘উহা নিয়মের মধ্যে চলিবে’—তাহা আসলে বাস্তবে দেখা যায় না। দিনের শেষে এইখানে নিজের ‘খেয়ালখুশি মতো’ সকল কিছু পরিচালনা করিবার প্রবণতাই প্রকট আকারে দেখা যায়। দেখা যায় দম্ভ-হুমকি-ধমকির প্রকাশও। উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির কিছু প্রভাবশালী এমন শরীরী ভাষায় চলাফিরা করেন যে, তাহারা যেন কোনো ট্রাইবাল জনপদের এক ও অদ্বিতীয় রাজা। উন্নয়নশীল বিশ্বে শিক্ষাদীক্ষা হইতে শুরু করিয়া সকল কিছুই সীমিত। ফলে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষও মনে করেন, এই ধরনের ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা করিতে পারেন না—এমন কোনো কাজ নাই।
কিন্তু মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণ বলিয়াছেন—‘সময় কখনো মানুষের নির্দেশিত পথে চলে না, মানুষকেই সময়ের নির্দেশিত পথে চলিতে হয়।’ ইহার সহিত লালন বলিয়াছেন—‘সময় গেলে সাধন হবে না।’ সুতরাং ‘সময়’ এইখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ‘সময়’ই একপর্যায়ে আসিয়া সকল কিছুর উত্তর দিয়া দেয়। সুতরাং যাহারা নিয়মকানুনকে পাশ কাটাইয়া সকল কিছু নিজের নিকট কুক্ষিগত করিতে চাহেন, তাহাদের অবস্থা শেষাবধি পরিহাসে পরিণত হয়। এই জন্য সকল কিছু কুক্ষিগত করিবার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করা উচিত নহে। নবিজি (স.) বলিয়াছেন যে, আল্লাহ তাহার কোনো বান্দাকে যদি মানুষের জন্য দায়িত্বশীল হিসাবে নিযুক্ত করেন, অতঃপর সেই ব্যক্তি যদি তাহার উপর অর্পিত দায়িত্ব খেয়ানত করিয়া মৃত্যুবরণ করেন, তাহা হইলে তাহার জন্য আল্লাহ জান্নাত হারাম করিয়া দেন।
আমাদের মনে রাখিতে হইবে, যখন কোথাও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, নিয়মকে পাশ কাটাইয়া চলা হয়—তখন সেইখানে অনিয়মই ‘নিয়ম’ হইয়া উঠে। সাধারণ মানুষও তখন মনে করেন, ‘কই, নিয়ম ভঙ্গের জন্য তো কোনো অ্যাকশন নেওয়া হইল না!’ সাধারণ জনগণের নিকট এই ধরনের বার্তা অত্যন্ত বিপজ্জনক ও ভুল বার্তা প্রদান করে। তবে আশাহীন হওয়া যাইবে না। সাময়িকভাবে অ্যাকশন নেওয়া হইতেছে না মানে এই নহে যে, কখনোই অ্যাকশন নেওয়া হইবে না। উন্নয়নশীল দেশসমূহের ভিতরে এই ধরনের আধাসামন্তবাদের গন্ধ কবে দূর হইবে, কেহ জানে না। অবস্থা এমন যে, ইহাদের নিকট নিয়মমতো সকল কিছু আশা করাটাই বড় দুরাশা। ইহা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের নির্বাহী চাহেন না। এইখানে তাহার যে কোনো অসহায়ত্ব অত্যন্ত দুঃখজনক; কিন্তু কাউকে না কাউকে তো ইহার সমাধান করিতেই হইবে। যাহারা নিয়মকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইতেছেন, তাহাদের মনে রাখিতে হইবে—এই দিন দিন না, আরো দিন আছে। মহাভারতে বলা আছে—‘যদি কোনো ঘটনায় মানুষ ভয়প্রাপ্ত হয়, তবে তাহার পরাজয়ই হয়।...নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে কখনো সন্দেহ প্রকাশ করা সঠিক নহে।’ সুতরাং শৃঙ্খলা রক্ষা করিবার স্বার্থে জানিতে হইবে নিজেকেও। মোদ্দা কথা, গণতন্ত্রসহ যে সিস্টেমই চালু থাকুক না কেন, আমাদের শৃঙ্খলা রক্ষা করিতেই হইবে।