কবিরা তাদের কবিতায় ফুটিয়ে তোলেন হৃদয়ের হাহাকার। যাপিত জীবনের গল্প তারা বলেন ছন্দবদ্ধ ভাষায়। যে কবিতা শুনতে জানেন না সে আজন্ম ক্রীতদাস হয়ে থাকবে বলে অভিশাপ দিয়েছিলেন কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে কথা বলেছিলাম কবি রাজীব কুমার দাশ ও মুনীরা সেতুর সঙ্গে।
কবি রাজীব কুমার দাশ জন্মেছেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর গ্রামে। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, সততা জেনারেল স্টোর, নিরন্ন ললাট, তুমি ছাড়া মৌনতা খাবো প্রতিদিন।
বইমেলায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘সুখবতী’ কী ধরনের কাব্যগ্রন্থ?
‘সুখবতী, এটা মূলত যাপিত জীবনের প্রেমের বা হাহাকারের বই। যে মানবপ্রেমে আমরা শিহরিত হই। বোধের নন্দনকানন থেকে যে প্রেম উঠে আসে। কবিতার মূল উপজীব্য কিন্তু এটাই। এটি এক বছরের মধ্যে লিখেছি। যাপিত জীবনের সব বিষয়গুলো আমি ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করি। আমি তীব্র প্রেম চাই মানবের হৃদয়ে। মনে করি আধাআধি বলে কিছু নেই/আধা পাকা আধা স্বাদ বিস্বাদ।’
পুলিশের চাকরি করে কবিতার মতো বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠলেন?
‘কবিতা আসলে হৃদয়ের আর্তনাদ। প্রতিটি মানুষই কবি। কেউ হয়তো ফুটিয়ে তুলতে পারে, কেউ হয়তো পারে না। যেমন আমাদের লোককবিরা গানের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। কবিতা কিন্তু হৃদয়ের হাহাকার। মানুষ এখন মন ভরে প্রেম করতে পারছে না। প্রেমিক নামের দস্যু হয়ে যাচ্ছে কেউ কেউ।’
কবিতাগুলো লিখতে গিয়ে কি কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
‘আমি একবার ধানমণ্ডি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এমন হেঁটে যাওয়া কিংবা কোনো একটা ঘটনা দেখে কবিতার ভাবনা মনে আসে। প্রেমিকাকে কতো কিছুর সাথে তুলনা করেও প্রকৃত প্রেম কই ভেবে লিখলাম, ‘চাঁদের পানে চিরদিন জোছনা চেয়ে চকোর, চকোরিনী সর্বস্বান্ত হয়েছে/চাঁদ কি কিছু দিতে পেরেছে?’
রাজীব কুমার দাশের কবিতা পড়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন, ‘বিরহপ্রধান কবিতা লিখলেও তিনি মূলত প্রেমের কবি। প্রেম আগে বিরহ পরে। প্রেমের ওপরপিঠেই তো বিরহের বাস। প্রেম না হলে- বিরহের বোধ জাগে না।’
বর্তমান সমাজের কবি লেখকদের সমাজের প্রতি দায়বদ্ধহীনতা ব্যথিত করে রাজীব কুমার দাশকে। সবাই যেন নিজের প্রচার চান। তিনি লেখালেখি শুরু করেছেন কলেজজীবন থেকে। লেখালেখিটা তার প্যাশন।
অমর একুশে বইমেলায় ঘুরতে ঘুরতে দেখা হয়ে যায় আরেক কবি মুনীরা সেতুর সঙ্গে। এবার তিনি প্রকাশ করেছেন কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘবালিকার গল্প’।
কবিতাগুলো কেমন?
‘কবিতাগুলো মূলত নারী-জীবনকেন্দ্রিক। একটা মেয়ে যখন প্রথম প্রেমে পড়ে, তার সেই প্রথম প্রেমের অনুভূতি, প্রেমিকের সাথে তার বিচ্ছেদকালীন মানসিক দ্বন্দ্ব, পুনরায় মিলন, সংসার জীবনের চাওয়া এবং পাওয়ার মাঝে যে একটা তীব্র মনস্তাত্ত্বিক সংকট দেখা দেয়.., স্বামীর মাঝে প্রেমিককে খুঁজে না পাওয়ার হতাশা ও তার একাকীত্বের কথাই এখানে কাব্যে কাব্যে বর্ণনা করা হয়েছে।’
তার মানে কাব্যগ্রন্থে কবিতার ধারাবাহিকতা রয়েছে?
‘হুম সেটা বলতে পারেন। আবার প্রতিটা কবিতাই আলাদা। দিনশেষে প্রতিটি মেয়েই আপন জগতে একা। বইয়ে ৭৭টি কবিতা রয়েছে।’
তো কবিতা লেখালেখিতে কীভাবে এলেন?
‘ছোটবেলা থেকে অনেক কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়তে ভালোবাসতাম এবং পড়তামও। লেখক হওয়ার বাসনাটা আমার তখন থেকেই ছিল। শুধু সময়ের অপেক্ষায় ছিলাম। মূলত ২০২১ সাল থেকে লেখালেখি শুরু করি। এবার বইমেলায় সেগুলোকে এক করে বই প্রকাশ করি।’
কেন মনে হলো মনের ভাব কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করা দরকার?
‘কবিতা হলো সাহিত্যের প্রাচীনতম ধারা। যখন ভাষার আবিষ্কার হয়নি মানুষ তখন গুহাচিত্রের মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে তাদের অস্তিত্বের ইতিহাস ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতো। মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো, অন্যের কাছে নিজেকে তুলে ধরা, আর ভাষা আবিষ্কারের পর এই পথ আরও সুগম হয়, তখন মানুষ ছন্দে ছন্দে তাদের সভ্যতা, শিল্প, জীবনাচরণ এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার সহজাত তাগিদ অনুভব করে। যেহেতু ভাষার সৃষ্টির প্রারম্ভে লিখন পদ্ধতির এতো বিস্তার বা আধুনিকায়ন ঘটেনি, মানুষ তাই ছন্দকেই বেছে নেয় তাদের ইতিহাস ও সভ্যতা ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যম হিসেবে। তাই কাব্য সাহিত্যের অনেক প্রাচীনতম শাখা। সেই হিসেবে আমিও আমার কথা ও অনুভূতিগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কবিতাকেই বেছে নিয়েছি- পূর্বপূরুষের রেখে যাওয়া পথের নিদর্শন হিসেবে।’