ভাষা আন্দোলনে আমরা সফল হইয়াছি, সুদীর্ঘ ছয় দশক হইল। দেশের গণ্ডি পার হয়ে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসন অলংকৃত করিয়াছে, তাহাও দুই যুগের অধিক হইয়াছে। এইভাবে বাংলা ভাষার পথপক্রিমা দীর্ঘতর হইয়াছে বটে, তথাপি বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের মর্যাদা সমুন্নত রাখিবার বেশ কিছু বিষয় ঝুলিয়া রহিয়াছে আজও! কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষা এবং জাদুঘর নির্মাণের নির্দেশনা চাহিয়া রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটি আদেশ প্রদান করেন এক যুগকাল পূর্বে। ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট হাইকোর্টের ঐ আদেশে শহিদ মিনারের পার্শ্বে গ্র্রন্থাগারসহ জাদুঘর নির্মাণ এবং জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস-সমৃদ্ধ তথ্যপঞ্জি রাখা, ভাষাসংগ্রামীদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়ন ও প্রকাশ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহিদ মিনার নির্মাণ ও মর্যাদা রক্ষাসহ আটটি নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছিল। দফা দফায় সময় লইয়াও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সেই রায় বাস্তবায়ন করিতে না পারায় ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠে। ঐ সময় সংস্কৃতি ও পূর্তসচিবকে তলব করিয়া ২০১৩ সালের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে গ্রন্থাগারসহ ভাষাশহিদ জাদুঘর নির্মাণ ও ভাষাসংগ্রামীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নসহ রায় বাস্তবায়নের নির্দেশ প্রদান করেন আদালত। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, মহামান্য হাইকোর্টের সেই নির্দেশেও কর্ণপাত করেন নাই সংশ্লিষ্টরা। পরবর্তীকালে ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি আবারও আদালত হইতে নির্দেশনা বাস্তবায়নের নির্দেশ জারি করিয়া বলা হয়, রায়ের ছয় মাসের মধ্যে তাহা বাস্তবায়ন করিতে হইবে। কিন্তু সেই নির্দেশেও কাহারো টনক নড়ে নাই।
মাতৃভাষার প্রশ্নে আপসহীন বাংলায় বায়ান্নর ঐতিহাসিক ঘটনাবলির স্মৃতির গাঁথুনিতে এবং আবেগ ও অনুভবের অপূর্ব মিশেলে গড়া শহিদ মিনারের কার্যক্রম লইয়া কর্তৃপক্ষের এই কচ্ছপগতিকে কোনোভাবেই মানিয়া লওয়া যায় না। ভাষার অধিকার রক্ষার শপথে বলীয়ান এই মিনার দাঁড়াইয়া আছে সাহস, সংগ্রাম ও প্রেরণার প্রতীক হইয়া। এখনো প্রতিটি সংকটে, আরজিতে-দাবিতে জাতি মিলিত হয় শহিদ মিনারে। অথচ সেই মিনার ঘিরিয়া কর্মকাণ্ডকেই উপেক্ষা করা হইতেছে বেরর পর বৎসর! কী হতভাগা জাতি আমরা! বাংলা ভাষার চর্চা, ভাষাসৈনিক, শহিদ মিনার, ভাষাস্তম্ভগুলোর পবিত্রতা রক্ষা প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবজ্ঞা-অবহেলার এই চিত্র অত্যন্ত দুঃখজনক। এই প্রবণতা দুর্ভাগ্যজনকও বটে। বারংবার আদালত নির্দেশ দেওয়ার পরও মন্ত্রণালয় কেন এই স্পর্শকাতর ব্যাপারে পদক্ষেপ লইতেছে না, তাহাও বোধগম্য নহে। তাহা ছাড়া রায় অনুযায়ী ভাষাসংগ্রামীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকাও এখন পর্যন্ত প্রকাশ করা যাইতেছে না। কীসের জন্য, কোন কারণে এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুকে ঝুলাইয়া রাখা হইতেছে, তাহা ভাবিবার বিষয় বইকি! রায় বাস্তবায়ন করিবার জন্য ভাষাসৈনিকদের সঙ্গে লইয়া নূতন প্রজন্ম যদি আবার রাজপথে নামিয়া পড়ে, তাহা কি সরকারের জন্য লজ্জাজনক হইবে না?
ভুলিয়া গেলে চলিবে না, ১৯৫২ সালে সর্বস্তরের বাঙালির গগনবিদারী আন্দোলন-বিক্ষোভের মুখে বাংলা ‘চিরস্থায়ী’ ভাষার মর্যাদা লাভ করে। এই মর্যাদা বহু গুণে বাড়িয়া যায়, যখন ১৯৯৭ সালে ‘বাংলা’কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার স্বীকৃতি দেয় ইউনেসকো। এই অর্জন বাঙালির জন্য যে কতটা আনন্দের, গর্বের ও গৌরবের, তাহা বুঝিতে পারা কি খুব কঠিন? শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে বাংলা ভাষার জাদুঘর নির্মাণে যত টাকা খরচ হইবে, তাহা বর্তমানে আমরা যে সকল মেগাপ্রজেক্ট বাস্তবায়ন করিতেছি, তাহার তুলনায় কি অতি নগণ্য নহে? ভাষার মাসে কেবল আনুষ্ঠানিকতা প্রদর্শন ও লোক দেখানো গতানুগতিক ভাষাপ্রেমী সাজিবার দরকার নাই। বাংলা ভাষার উন্নয়নে আমরা মৌলিক কাজ দেখিতে চাই। মাতৃভাষার প্রতি দেখিতে চাই গভীর মমত্ববোধ ও অকৃত্রিম ভালোবাসা। বৎসরের বাকি ১১ মাসেও যেন সেই ভালোবাসার নিদর্শন রাখিতে পারি আমরা। এই জন্য কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারকে ঘিরিয়া সকল পরিকল্পনা ও নকশার ত্বরিত বাস্তবায়ন কাম্য। এই ব্যাপারে আর অবজ্ঞা-অবহেলা নহে। দ্রুত আদালতের রায় বাস্তবায়ন করা হউক, ইহাই আজিকার প্রত্যাশা।