গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতির চ্যালেঞ্জসমূহ

আমাদের দেশে প্রায়শ দেখা যায়, ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লইয়া কোনো একটি শুভ উদ্যোগ গ্রহণ করিবার পর কিছুদিন যাইতে না যাইতেই তাহা ঝিমাইয়া বা মুখ থুবড়াইয়া পড়ে। সাফল্যের ধারাবাহিকতা আমরা অনেক ক্ষেত্রে ধরিয়া রাখিতে পারি না। ইহা আমাদের বড় ব্যর্থতাই বটে। অনেক কাঠখড় পুড়াইয়া শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ব্যয় ও ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় গুচ্ছ ভর্তি প্রক্রিয়ার (জিএসটি—ইউনিভার্সিটি ইনটিগ্রেটেড অ্যাডমিশন সিস্টেম) অগ্রযাত্রা হইয়াছিল। ইহার পশ্চাতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদেরও উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা ছিল; কিন্তু কয়েক বৎসর না যাইতেই এই পরীক্ষা পদ্ধতি লইয়া প্রশ্ন তুলিতেছেন কেহ কেহ। বিশেষ করিয়া, সেই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের একশ্রেণির শিক্ষক ইহা বন্ধে যেন উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছেন। শিক্ষার্থী-অভিভাবকের আর্থিক সাশ্রয়, লম্বা সময় ধরিয়া আলাদা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার বিড়ম্বনা প্রভৃতি হইতে নিষ্কৃতি পাইবার জন্য উল্লিখিত পদ্ধতির অবতারণা হয় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ হইতে। প্রথম সেশনের পরীক্ষাতে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন পক্ষের সমন্বয়হীনতার কারণে কিছু গলদ পরিলক্ষিত হয়। আশা করা হইয়াছিল, ইহা শীঘ্রই দূর হইবে; কিন্তু এই সমন্বয়হীনতা এখনো দূর হয় নাই। সবচাইতে বড় কথা হইল, এখন পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রত্যাশা অনুযায়ী এই পদ্ধতি ও নিয়মের অধীনে আনা যায় নাই। দেশের মেডিক্যাল কলেজগুলিতে এই সিস্টেম ভালোভাবে কাজ করিলেও, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কেন ব্যর্থতার প্রশ্ন আসিবে? টেকনিক্যাল বিষয়গুলি মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা হইতে আমরা সহজেই আয়ত্ত করিতে পারি। তাহা ছাড়া একটি নূতন পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রথম দিকে কিছু সমস্যা থাকিবেই। তাহা সমাধানের পথ খুঁজিয়া সামনের দিকে অগ্রসর হওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। মাথাব্যথার জন্য মাথা কাটিয়া ফেলিবার কথা আমরা কস্মিনকালেও ভাবিতে পারি না।

আশার কথা হইল, নানাবিধ সুবিধার কথা বিবেচনায় গুচ্ছ পদ্ধতিকে টিকাইয়া রাখিবার প্রত্যয় ব্যক্ত করিয়াছেন শিক্ষামন্ত্রী। পদ্ধতিটিকে পরিশীলিত করিয়া চলমান রাখিবার বিষয়ে কথা বলিতেছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরাও। বিভিন্ন সুবিধাহেতু এই পদ্ধতিকে সময়োপযোগী মনে করিতেছি আমরাও। এই পদ্ধতিতে দুই সেশনে ভর্তি কার্যক্রম চালাইবার পর দেখা যাইতেছে, ভর্তি পরীক্ষায় দীর্ঘসূত্রিতা কাটিতেছে না। ভর্তিতে কালক্ষেপণ, উপাচার্যদের সিদ্ধান্তহীনতা ইত্যাদি কারণে গুচ্ছে থাকিতে অনীহা প্রকাশ করিতেছে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়। এইখানে বলিয়া রাখা দরকার, এই সকল সমস্যার জন্য তো শিক্ষার্থী কিংবা অভিভাবকগণ দায়ী নহেন। বরং ব্যয় কমিবার পরিবর্তে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা করিয়া টাকা প্রদানের কারণে পূর্বের তুলনায় তাহাদের ব্যয় অধিক বাড়িয়াছে। বাড়তি টাকা খরচ করিয়াও যথাসময়ে ক্লাসে বসিতে পারিতেছেন না তাহারা। সেশনজটের ধকল কাটাইয়া উঠিবার জন্য যেই গুচ্ছ পদ্ধতির অবতারণা, তাহার কারণেই এখন গচ্চা যাইতেছে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান শিক্ষাবর্ষ। ইহা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিভিন্ন জটিলতার কারণে বিড়ম্বনার শিকার শিক্ষার্থীরা যথাসময়ে ভর্তি হইতে না পারায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মূল্যবান আসন ফাঁকা থাকিয়া যাইতেছে, ইহাও পরিতাপের বিষয়। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু শিক্ষাজীবনের স্বার্থে কীভাবে এই সকল সমস্যার সমাধান করা যায়, তাহাই ভাবিতে হইবে সর্বাগ্রে।  

প্রথমত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় চারটি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছভুক্ত না হওয়ায় ইহার সুফল পাওয়া যাইতেছে না। তাহাদের অন্তর্ভুক্ত করা হইলে কিছু সমস্যার এমনিতেই সমাধান হইবে। দ্বিতীয়ত তুলনামূলক কম খরচ ও পড়াশুনার মান ভালো হওয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হইতে শিক্ষার্থীরা উন্মুখ হইয়া থাকেন। সেইখানে আসন খালি থাকিবে কেন? ইহা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছাড়া আর কিছুই নহে। একটি কেন্দ্রীয় ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অপেক্ষমাণ মেধা তালিকা প্রকাশ করা হইলে এবং অনলাইনে অর্থ প্রদানের সুযোগ থাকিলে ভর্তি কার্যক্রম এক মাসেই সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। আমরা মনে করি, বিদ্যমান ত্রুটিগুলির দ্রুত সমাধান করিয়া এবং সকল প্রকার সমন্বয়হীনতা দূর করিয়া এই প্রক্রিয়াকে আরো সহজসাধ্য করিতে হইবে। জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়াই এই ব্যাপারে শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।