মেলায় অনেক মানুষ। অনেক ভিড়। বইমেলার শেষ শুক্রবার। ভিড় তো হবেই। কিন্তু সে তুলনায় বিক্রি খুব বেশি নয় বলে আক্ষেপ শোনা গেল প্রকাশকদের কণ্ঠে। অনন্যার প্যাভিলিয়নে কথা হয় কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে। বলেন, শুরুতে যে আশা মেলা দেখিয়েছিল শেষবেলায় পাঠকের সেই আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। করোনাকালের পরে বইমেলায় অনেক মানুষ এসেছে ঠিক। কিন্তু বই কেনার আগ্রহ কম। এটা ভালো লক্ষণ নয়। এমন চলতে থাকলে একটা সময় বইমেলা বেড়ানোর আর সেলফি তোলার কেন্দ্র হয়ে উঠবে। তবে, শিশুদের বই কেনার প্রতি আগ্রহ দেখেছেন তিনি। এটাকে ইতিবাচক লক্ষণ বলে মত দিলেন স্বনামধন্য এই লেখক।
অনন্যার প্যাভিলিয়নেই ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। মেলায় প্রকাশিত হয়েছে তার ‘আমার রাজনীতির রোজনামচা’। শুক্রবার বিকালে অনন্যা প্রকাশনীর প্যাভিলিয়নে বইটির মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। তিনি বললেন, আমার ৪৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিক, বাঁকবদল, বক্তৃতা স্থান পেয়েছে বইটিতে। রাজনীতির শুরুর থেকে ২০২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৪ বছরের রাজনীতির রোজনামচা এ বইয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। আমার আত্মজীবনী লেখার প্রাথমিক কাজ হলো এ বইটি। তিনি জানান, লন্ডনে থাকার সময় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে তার যুক্ততার কথাও উঠে এসেছে বইটিতে। ১৯৭৯ সালে শহিদ জিয়াউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। সে সময় থেকেই আমি জিয়াউর রহমানের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও জেলা সভাপতি নির্বাচিত হই। পর্যায়ক্রমে যুগ্ম-মহাসচিব ও ২৮ বছর যাবত স্থায়ী কমিটির সদস্য।
ঐতিহ্য প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজল জানালেন, বই বিক্রি তুলনামূলক কম। তাছাড়া, বেশি দামের চাইতে কম দামের বইয়ের বিক্রির হার বেশি।
বইমেলার আর বাকি আছে মাত্র চার দিন। ফলে বইয়ের টানে মানুষের পদচারনা বেড়েছে মেলায়। গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বইমেলা জনসমুদ্রে রূপ নেয়। দল বেঁধে এসেছে তরুণরা। ছেলেমেয়ের হাত ধরে পরিবারের সব সদস্যরা এসেছেন মেলায়। দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি পর্যন্ত দীর্ঘলাইন। সেই লাইন মিশেছে স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ও বাঙালির সৃজন ও মননের প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে। মেলা নিয়ে উৎসাহের কমতি ছিল না মানুষের। ছিল সেলফি তোলা, ভাষা শহিদদের প্রতি সম্মান জানিয়ে পোশাক পরে মেলায় আসার মানুষের ঘুরে বেড়ানো। বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে লেখক, প্রকাশক ও লেখকদের শুভানুধ্যায়ীদের ভিড় বইমেলার প্রতি সবার ভালোবাসার কথাই জানান দিয়েছে।
গতকাল শুক্রবার ছিল শিশু প্রহর। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত শিশুপ্রহরে দূরন্তপনায় মেতে উঠে শিশুরা। বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, গতকাল মেলার ২৪তম দিনে নতুন বই এসেছে ২৩৯টি ।
স্পর্শ ফাউন্ডেশনের ৩০টি ব্রেইল বইয়ের মোড়ক উন্মোচন : বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজে তথ্য কেন্দ্রের সামনে এ বছরের প্রকাশিত ৩০টি ব্রেইল বইয়ের প্রকাশনা উৎসব করেছে স্পর্শ ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরে ১৩১টি ব্রেইল বই প্রকাশ করেছে। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি নূরুল হুদা, অমর একুশে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম, সিসিমপুরের মহা ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ শাহ আলম প্রমুখ। অনুষ্ঠানটি সমন্বয় করেন স্পর্শ ফাউন্ডেশনের প্রধান উদ্যোক্তা নাজিয়া জাবীন।
শিশু-কিশোরদের প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান : শুক্রবার শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার প্রদান করা হয়। বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, সভাপতিত্ব করেন নাট্যজন ফেরদৌসী মজুমদার। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা : ক-শাখায় ওয়াকিয়া নূর (প্রথম), আফফান আল হাসনাইন (দ্বিতীয়), রুজাইনাহ মারিফা (তৃতীয়)। খ-শাখায় প্রত্যয় পাল রাজ (প্রথম), তাসনিয়াহ সিদ্দিক (দ্বিতীয়), শাফিন উদ্দিন আহম্মেদ (তৃতীয়)। গ-শাখায় অর্নিলা ভৌমিক (প্রথম) আল মুমিনুর (দ্বিতীয়), জায়ীফা তাসনীম (তৃতীয়) স্থান লাভ করেন। আবৃত্তি প্রতিযোগিতা : ক-শাখায় আরোহী বর্ণমালা (প্রথম), অংকিতা সাহা রুদ্র ((দ্বিতীয়) এবং জুমানা হোসেন (তৃতীয়)। খ-শাখায় সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ (প্রথম), আনিশা আমিন (দ্বিতীয়) এবং অদ্রিতা ভদ্র (তৃতীয়) এবং গ-শাখায় আদিবা সুলতানা (প্রথম), তাজকিয়া তাহরীম শাশা (দ্বিতীয়) এবং সিমরিন শাহিন রূপকথা (তৃতীয়) স্থান লাভ করেন। সংগীত প্রতিযোগিতা : ক-শাখায় নীলান্তী নীলাম্বরী তিতির (প্রথম), অন্বেষা মজুমদার (দ্বিতীয়) এবং সার্থক সাহা (তৃতীয়)। খ-শাখায় রোদোসী নূর সিদ্দিকী (প্রথম), তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় (দ্বিতীয়) এবং মৈত্রেয়ী ঘোষ (তৃতীয়) স্থান লাভ করেন।
মেলামঞ্চে অনুষ্ঠান :বইমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আধুনিকতা, উত্তর-আধুনিকতা ও পরবর্তীকালের সাহিত্যতত্ত্ব শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মাসুদুজ্জামান। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন নিরঞ্জন অধিকারী, এজাজ ইউসুফী, বিপ্লব মোস্তাফিজ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাশিদ আসকারী।
গতকাল লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন বই নিয়ে আলোচনা করেন আশরাফ জুয়েল, রণজিৎ সরকার, মেহেদী হাসান শোয়েব, কানিজ পারিজাত। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন রেজাউদ্দিন স্টালিন, নাজমুন নেসা পিয়ারি, রওশন ঝুনু, ফরিদা ইয়াসমিন সুমি, নাঈমা খানম, মাদুসুল হক, হাসান মাহমুদ, প্রত্যয় জসিম, মাহী ফ্লোরা, প্রসপারিনা সরকার এবং মনিরুজ্জামান রোহান। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শাহ কামাল সবুজ, আজহারুল হক আজাদ, শিরিন সুলতানা, ফারজানা মালিক নিম্মী, অনিকেত রাজেশ। এছাড়া ছিল কাঙাল মজিবরের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কাঙ্গাল হরিনাথ সাংস্কৃতিক সংগঠন’, এ. কে. আজাদের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আনন্দন’, শাহাবুদ্দিন আহমেদ দোলনের পরিচালনায় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘সুর সুধা সংগীতায়ন’, সিদ্দিকুর রহমান পারভেজের পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘মুক্তধারা সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র’, সুবর্না আফরিনের পরিচালনায় আবৃত্তি সংগঠন ‘কিংবদন্তী আবৃত্তি পরিষদ’-এর পরিবেশনা। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবিদা রহমান সেতু, আফরোজা খান মিতা, মারুফ হোসেন, আশরাফ উদাস এবং অগ্নিতা সিকদার মুগ্ধ।