হাইকোর্টের আদেশে ২৮ বছর স্থগিত হত্যা মামলার বিচার!

সারাহাত সালমা, এখন বয়স ৩৮ বছর। থাকেন অস্ট্রেলিয়ায়। ১৯৮৯ সালে ছিলেন ভিকারুননিসা নুন স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুল ছুটি শেষে দাঁড়িয়েছিলেন মায়ের অপেক্ষায়। কিন্তু মাকে আর পাননি ,পেয়েছেন হাসপাতালের মর্গে নিথর দেহ।

সন্তানকে নিতে এসে স্কুলে পৌঁছানোর কয়েক মিনিট আগেই ছিনতাইকারীর গুলিতে মৃত্যুবরণ করতে হয় মাকে। ওই ঘটনায় করা মামলার বিচারও শুরু হয় নিম্ন আদালতে। কিন্তু সেই হত্যাকান্ডের বিচার আজও পায়নি সারাহাত ও তার পরিবারের সদস্যরা। পুলিশের তদন্তে গাফিলতির কারনে বিচারের মাঝপথে এসে হাইকোর্টের আদেশেই ২৮ বছর ধরে নিম্ন আদালতে মামলাটির বিচার কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

দীর্ঘদিন বিচার বন্ধ থাকায় সাক্ষী খুঁজে না পাওয়ার শঙ্কা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। মামলার সর্বশেষ তদন্তকারী কর্মকর্তা সম্প্রতি বিষয়টি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের নজরে আনলে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি       মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটি শুনানির জন্য গতকাল আবেদন করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মোতাহার হোসেন সাজু ইত্তেফাককে বলেন, ‘হাইকোর্টের আদেশে হত্যা মামলার বিচার ২৮ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে এর চেয়ে দু:খজনক ঘটনা আর কিছইু হতে পারে না। তদন্ত সংস্থা যদি আগেই এই স্থগিতাদেশের তথ্য আমাদের নজরে আনত তাহলে এতদিন মামলার বিচারকাজ বন্ধ থাকত না’।

মামলার বাদি সালাম চৌধুরী বলেন, আমি শান্তিপূর্ণ মানুষ। নতুন করে কোন ঝামেলায় পড়তে চাই না। তার ভাই ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতালের চিকিত্সক ডা. হাসান আলী চৌধুরী বলেন, ‘ওই হত্যাকান্ডের পর আমাদের রাজারবাগের বাসায় শীর্ষ রাজনীতিবিদরা এসেছিলেন। সমবেদনা জানিয়েছেন। কিন্তু আজও বিচার পাইনি আমরা। কবে পাব তাও জানি না’।  

ঘটনাক্রম: সগিরা মোর্শেদ সালাম ১৯৮৯ সালে ভিকারুননিসা নুন স্কুল থেকে মেয়েকে আনতে যান। বিকাল ৫ টায় সিদ্ধেশ্বরী রোডে পৌঁছামাত্র মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তার হাতে থাকা স্বর্ণের চুড়ি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় নিজেকে বাঁচাতে দৌঁড় দিলে গুলি করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান তিনি।

এ ঘটনায় ওইদিনই রমনা থানায় মামলা করেন তার স্বামী আ. সালাম চৌধুরী। মামলা নম্বর: ৪৫(৭)৮৯। পরে মিন্টু ওরফে মন্টু ওরফে মরণের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ।

অধিকতর তদন্তের আদেশ:

১৯৯১ সালের ১৭ জানুয়ারি আসামি মন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতের বিচারক আবু বকর সিদ্দীক। সাক্ষ্যগ্রহন করা হয় সাতজন সাক্ষীর। সাক্ষ্যে মারুফ রেজা নামে এক ব্যক্তির নাম আসায় অধিকতর তদন্তের আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এতে বলা হয়, তদন্তকালে ডিবির তদন্তকারী দারোগাগন আসামি মন্টু এবং তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক নিকটাত্মীয় এই মামলায় গ্রেপ্তার হন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত রিকশাচালক দুজনকে সনাক্ত করলেও অজ্ঞাতকারনে একজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমানে আসামি মন্টু ছাড়া অনেক লোক জড়িত আছে এজন্য অধিকতর তদন্ত প্রয়োজন। ওই বছরের ২৩ মে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেয় আদালত। এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন মামলা (১০৪২/১৯৯১) করেন মারুফ রেজা।

১৯৯১ সালের ২ জুলাই ওই তদন্তের আদেশ ও বিচারকাজ ছয় মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তদন্তের আদেশ কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করে। ১৯৯২ সালের ২৭ আগস্ট ওই রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মামলার বিচারকাজ স্থগিত থাকবে মর্মে আরেকটি আদেশ দেওয়া হয়। ওই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের উদ্যোগ না নেওয়ায় ঘটনার পর ৩০ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার বিচার আজও শেষ হয়নি।