৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের কিছু বিরল লড়াই

পাকসেনারা ২৭ শে মার্চ সমসের নগর বিমানঘাঁটি দখল করতে আসে। কৈলাসহর থেকে মাত্র ৩০ মিনিটের পথ সমসেরনগর। যোগাযোগের দিক থেকে এবং সামরিক দিক থেকে ছোট ছোট টিলা জঙ্গল ও চা বাগানে ঘেরা এই অঞ্চলটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিমানবন্দরটিকে যাতে স্থায়ী ঘাঁটি বানাতে না পারে সেজন্য মুক্তিবাহিনী আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়। ই পি আর এর এক কোম্পানি জওয়ান এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদানে এক শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলা হয়েছিল। সুবেদার সামসুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে ই পি আর-রা সেদিন প্রতিরোধ করে। সঙ্গে ছুটিতে আসা একজন সেনাবাহিনীর জওয়ান মাসুদ সেও অংশ গ্রহণ করে। 

তাছাড়া মুজাহিদিন ট্রেনিং প্রাপ্ত সৈন্যদল বাজারের অন্যতম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর ও যোগ দিয়েছিল। আরো অনেকের সাথে তখন পরিচয় হয়। এদের নাম আর মনে নেই। গফুরের কথা বিশেষ করে মনে পড়ার কারণ হচ্ছে ওর সাহসী ভূমিকা দেখে আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হই। এবং কখন যে আমরা বন্ধু হয়ে উঠি বুঝতে পারিনি। অনেকগুলো অপারেশনে তার সাথে যোগ দিই। 

সেদিন সমশেরনগর বিমান বন্দরে এক কোম্পানি ই পি আর, ১১ জন মুক্তি যোদ্ধা ও দুই শতাধিক জনতা প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এটিই ছিল সিলেটের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ। বিমান বন্দরে প্রতিরোধের পর এই বিমান ঘাঁটিতে যাতে আর বিমান অবতরণ করতে না পারে এই চিন্তা করে সেই সময় বিমানঘাঁটিটি নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। সমসেরনগর আক্রমণের আগে পাক বাহিনী একটি জীপে করে ভানুগাছ ডাকবাংলাতে যায়। রাস্তায় হাজার হাজার জনতা তাদের পথ

অবরোধ করে। সমশেরনগর আক্রমণের আগে পাক বাহিনী একটি জীপে করে ভানুগাছ ডাকবাংলাতে যায়। রাস্তায় হাজার হাজার জনতা তাদের পথ অবরোধ করে। জনতা তাদের লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে। পাকবাহিনীও এলোপাথারী গুলি ছুঁড়ে। কয়েকজন সাধারণ বাঙালিকে ধরে নিয়ে আসে ওরা। অবশ্য সমশের নগরে প্রতিরোধে এইসব পাক সেনারা সকলেই নিহত হয়।

২৮শে মার্চ আবার সমশেরনগর বাজারে আক্রমণ করে হানাদার বাহিনী। এর মধ্যে সমশের নগরের ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমেদ, সাজ্জাদুর রহমান, আমজাদ আলী প্রমুখ এক গোপন মিটিং কর সীমান্ত ফাঁড়ি গুলোর সমস্ত ই পি আরদের মুক্তি যুদ্ধে সামিল হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। ভোরে আলো ফুটতেনা ফুটতেই হাজার হাজার জনতা চারিদিক থেকে মিছিল সহকারে সমশেরনগর বাজারে জড়ো হতে থাকে। এমন সময় মৌলভীবাজারের দিক থেকে ৩ টি সামরিক গাড়ী করে রেলষ্টেশনের কাছে একটি মালগাড়ীর কামড়া থেকেই বাজারের দিকে জনতাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়তে থাকে ওরা। ভেবেছিল গুলিছুঁড়লেই জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাবে। কিন্তু সে দিন সমশেরনগরের আমান উল্লার বিলিডং এর উপরে এবং নীচে একটি মিষ্টির দোকানে দেয়ালের আড়ালে মুক্তি যোদ্ধারা পজিশন নিয়েছিল। পাকবাহিনী গুলি ছুঁড়তেই দুজন ই পি আর বিল্ডিং এর ছাদ থেকে পাল্টা গুলি ছুঁড়ে। মুহূর্তের মধ্যে এক পাক সেনা লুটিয়ে পড়তে দেখা যায়। দেখতে দেখতে আরও একজন আহত হয়ে কাতরাতে থাকে। চারিদিক থেকে জনতা বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায়। হাজার হাজার জনতার উন্মত্ত চীৎকারে পাক সেনারা দিশেহারা হয়ে পালিয়ে যেতে দেখা যায়। 

একটু পরেই আবার ফিরে আসেও ততোক্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল বেড়ে গেছে। দেখতে দেখতে আরো ই পি আর এসে জড়ো হয়েছিল। পাক কনবয়গুলো এসে পড়ে মুক্তি যোদ্ধাদের রাইফেলের রেঞ্জের মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠে বাঙালি ই পি আর ও মুক্তি যোদ্ধাদের হাতের অস্ত্র। এখানে সব পাক সেনাই নিহত হয়। ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল সহ কয়েকজন পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও বিফল হয়। মুক্তি যোদ্ধাদের হাতে ধরা পড়ে প্রাণ দেয়। এই সময় মৌলভীবাজারে তখন পাক বাহিনীর লেঃ কর্ণেল সুলতান মাসুদ, মেজর তারেক, ক্যাপ্টেন গনি, মেজর আসগর অবস্থান করছিল। এই পরাজয় এর সংবাদ পেয়েই তারা ঢাকার সাথে যোগাযোগ করে বিমান হামলার পরামর্শ দেয় এবং পাক বাহিনী যে কোন মূল্যে সমশেরনগর বিমান ঘাঁটি দখলের প্রস্তুতি নেয়। 

২৯শে মার্চ পাকবাহিনী আবার সমশেরনগরে বিমান হামলা করে। মানুষজন আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু বিমানবন্দর দখল নেয়া সম্ভব হয়নি কারণ এটিকে আগেই বিমান অবতরণের অনুপযোগী করে তোলা হয়েছিল। রাগে ক্ষোভে পাক সেনারা কিছু এলোপাথারী গুলি ছুঁড়ে চলে যায়। চাতলাপুর চা বাগানের বাংলোতে বিমান থেকে যে সেলিং করা হয়েছিল সেই দাগগুলো এখনও রয়ে গেছে। সেদিন চাতলাপুর চা বাগানে সেই বাংলোতে কিছুক্ষণ ছিলাম। বর্তমান ম্যানাজার আসান উল্লাহ্ সাহেব জানালেন এই দাগগুলোকে অক্ষত অবস্থায় রেখেই বাংলোটির সংস্কার করা হয়েছে। সেই সময় বেঙ্গল রেজিমেন্টের খালেদ মোশারফ নামে এক বাঙালি মেজর সমশেরনগরে একা পড়ে গিয়েছিলেন। তাই মেজর জেনারেল আব্দুল রবের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা অরুনাভ পাল, আব্দুল মান্নান আমজাদ আলী প্রমুখের সাহায্যে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন তিনি। তখন ৩৩ জন বাঙালি ই পি আর বেশ কয়েকটি লাস নিয়ে একটি জীপে করে আসে রবির বাজার। এই সব ই পি আর বিদ্রোহ করে মুক্তি যুদ্ধে যোগ দেয়। সমশের নগরে বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র যোগাড় হয়েছিল। পৃথিমপাশার রাজা সাহেবের নির্দেশে এদের নিয়ে অস্ত্র সমেত লুৎফুর রহমান চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর প্রমুখ গাজীপুর চা বাগানে নিয়ে রাখেন। যেখানে সহজে পাক বাহিনী যাবেনা। এবং যেখান থেকে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া সহজ ও নিরাপদ হবে। সেই সময় আলীনগর ই পি আর ক্যাম্প এর পাকিস্তানী ই পি আরদের মুক্তি যোদ্ধারা হত্যা করে। বাঙালি ই পি আররা আলীনগর ক্যাম্প ত্যাগ করে। মুক্তিযোদ্ধারা চাতলাপুর বিওপিতে অবস্থানরত দুজন পাকিস্তানী ই পি আরকেও হত্যা করে। ফলে এই বাগানে অবস্থানরত ই পি আর এর বাঙালি সুবেদার সামসুল হক চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। 

২৯ শে মার্চ পাক বাহিনী সমশের নগরে ব্যপক লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, হত্যালীলা চালায়। কমলগঞ্জ সহর আওয়ামীলীগের সংগঠক আব্দুল গফুরের বাড়ীতে গিয়ে হাজির হয় পাক সেনারা। গফুর সাহেবকে না পেয়ে তার বৃদ্ধ পিতা ও দুই ভাইকে হত্যা করে। এরপর প্রতিদিন দেশীয় দালালদের সহযোগে হত্যালীলা চালায়। সেইসময় বিমান বন্দর এলাকায় দাঁড় করিয়ে নিরীহ মানুষদের হত্যা করা হতো। বিমান বন্দরের মাটি লাল হয়ে উঠেছিল অনেকগুলো স্থানে। ২৯ শে মার্চ পাক সেনারা জীপ নিয়ে মৌলভীবাজার আক্রমণ করে। শ্রীনিবাস ভট্টাচার্য নামে এক ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকে হত্যা করে। কিন্তু এই সংবাদ পেয়েই বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত ই পি আর, পুরানো ট্রেনিং প্রাপ্ত এমন মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যান মৌলভীবাজারের দিকে। গড়ে তুলা হয় প্রচন্ড প্রতিরোধ। গণকবরের কাছে এখনও সেই সাক্ষী বহন করছে। মৌলভীবাজার সদরের কামালপুর মৌজার ত্রৈলক্য বিজয় মৌজায় এই প্রতিরোধে ১১ জন পুরানো ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তি যোদ্ধা, ৩৩ জন বাঙালি ই পি আর এবং প্রায় দুই শতাধিক সাধারণ মানুষ অংশ নেয়। 

সেদিন জোরা মন্দিরের দুই দিকে মুক্তিযোদ্ধারা পজিশন নেয়। মেইন রোডে পাক সেনারা। এখানে ৭০ জন পাক সেনা এবং ১১ জন মুক্তি যোদ্ধা নিহত হন। বহু সাধারণ লোকও প্রাণ হারান। এই ৭০ জন পাক সেনা খতম হওয়ার পর পাক বাহিনী মনোবল অনেকটাই হারিয়ে ফেলে। পিছু হঠতে থাকে ওরা। পাক বাহিনী শেরপুরে গিয়ে খাঁটি গেড়ে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। শেরপুর হচ্ছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভী বাজারের সংযোগ স্থল। ঢাকা বা অন্য যে কোন জেলার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে শেরপুর ফেরী অতিক্রম করে যেতে হয়। পাকিস্তানী সেনারা তখন শেরপুর থেকে সাদিপুর ফেরী পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অবস্থান করে অপেক্ষা করছে মুক্তি যোদ্ধাদের জন্য। এদিকে পাকবাহিনীর তুলনায় মুক্তিযোদ্ধার হাতে অস্ত্রও অনেক কম। 

শেরপুরের এই ঘটনার সংবাদ যায় মানিক চৌধুরীর কাছে। মানিক চৌধুরী তখন মাধবপুরে সিলেট সীমান্তে ব্যারিকেড সৃষ্টি করলেন। মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসারের কাছ থেকে পাওয়া ১২ জন কনস্টেবল এবং ১২ টি রাইফেল শুধু সম্বল। চুনারুঘাট এলাকার প্রায় ৫ হাজার চা শ্রমিক তীর ধনুক নিয়ে প্রস্তুত। এমন সময় মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বে একদল সেনা পালিয়ে এসেছেন। তাদের নিয়ে ঢাকা যাবেন। পেছন থেকে পাঞ্জাবী সৈন্যরা ধাওয়া করে আসছে খালেদ মোশারফকে ধরবার জন্য। মানিক চৌধুরী সংবাদ পাঠালেন কর্ণেল রব এর কাছে হাবিগঞ্জে। ট্রেজারী থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করার জন্য। কারণ শেরপুর ও সাদিপুরে তখন পাঞ্জাব রেজিমেন্টের যথাক্রমে দুই প্ল্যাটুন ও এক প্ল্যাটুন সৈন্য অবস্থান করছে। তাদের সাথে ছিল স্বয়ংক্রিয় মেশিন গান, থ্রি ইঞ্চ মর্টার, চাইনিজ রাইফেল ও প্রচুর গোলাবারুদ। পাশাপাশি সাদিপুরের ফেরী নৌকাগুলোও ছিল তাদের দখলে। এমতাবস্থায় মুক্তিযোদ্ধাদের আরো অস্ত্রের প্রয়োজন। এমন সময় খালেদ মোশারফের সাথে সাক্ষাৎ ঘটে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর। খালেদ মোশারফ জানালেন তাঁকে কুমিল্লা হয়ে ঢাকা যেতেই হবে। সেখানে যুদ্ধ চলছে, প্রথমে ঢাকা মুক্ত করতে হবে। মানিক চৌধুরী পরে আর তাকে আটকাননি। খালেদ মোশারফ তেলিয়াপাড়া হয়ে মাধবপুর ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার পথে চলে গেলেন। 

এদিকে ইতিমধ্যেই হাবিগঞ্জ থেকে কর্ণেল রব সংবাদ পাঠালেন এস ডি ও সাহেব এবং এস ডি পি ও সাহেব অস্ত্র দিচ্ছেন না। কয়েক হাজার মানুষ তখন ট্রেজারীর সামনে জড়ো হয়েছে। উল্কার বেগে মানিক চৌধুরী হাবিগঞ্জ পৌঁছেই উপস্থিত জনতার সামনে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। তার ভাষণ শুনে উপস্থিত জনতা একস্বরে চীৎকার করে জানালেন এক্ষুনি অস্ত্র না দিলে কেড়ে নেয়া হবে। এরপরই মানিক চৌধুরী রণমূর্ত্তি ধারণ করলেন। 

মানিক চৌধুরীর এইরূপ দেখে এস ডি ও ডাঃ আকবর আলী বলেন-“নিয়ে যান মানিক চৌধুরী অস্ত্র। যা হবার হবে। হয় ডি সি না হয় ফাঁসি!” এই উক্তিটি আজও হাবিগঞ্জের মুক্তি যোদ্ধাদের কাছে ইতিহাস হয়ে আছে। হবিগঞ্জ ট্রেজারী বিল্ডিং থেকে সেদিন ৫৫০ টি রাইফেল, ২২০০০ রাউন্ড গুলি মুক্তি বাহিনীর হাতে আসে। আনসার মোজাহিদ বা এক্স সার্ভিস ম্যান যারা সেই সময় মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতে আসে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয়। এমনকি যারাই অস্ত্র ধরা শিখেছে তাদের হাতেও রাইফেল তুলে দেয়া হয়। সকলকে নিয়ে হবিগঞ্জ বি ডি হল প্রাঙ্গণে সমবেত হয়ে মুক্তি যুদ্ধের শপথ নেয়া হয়। কর্ণেল রব মানিক চৌধুরীকে কমান্ডেন্ট উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই অনুষ্ঠানে মেজর দত্ত উপস্থিত ছিলেন না। পাকিস্তান বাহিনীর একজন ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের একজন সিনিয়র মেজর ছিলেন চিত্তরঞ্জন দত্ত। ৯০ দিনের ছুটি নিয়ে তিনি বাড়ি আসেন। ২৫ মার্চের গণহত্যার সংবাদ পেয়েই তিনি কাজে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত নেন। এরই মধ্যে মানিক চৌধুরীর কাছে থেকে সংবাদ পেয়ে মুক্তি যোদ্ধাদের সাহায্যের জন্য শেরপুর ছুটে যান। মেজর দত্ত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ৪নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন। যুদ্ধ পরিচালনা করে পরবর্তী কালে তিনি মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হন। 

এদিকে হবিগঞ্জে শপথ গ্রহন অনুষ্ঠান শেষে কর্ণেল রব, কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী মৌলভী বাজারের দিকে রওয়ানা হন। তাদের সঙ্গে মেজর দত্ত এসে যোগ দেন। গোটা কয়েক ট্রাকে করে বিরাট বাহিনী নিয়ে তারা রওয়ানা হন। মৌলভীবাজার যেতে না যেতেই তিন জন 'রেকী' পার্টির সদস্যকে গ্রেপ্তার করে হাবিগঞ্জ জেলে পাঠিয়ে দেন। হবিগঞ্জ জেলখানাটি তখন মুক্তি যোদ্ধাদের দখলে ছিল। মুহুর্তেই মৌলভীবাজার পুরোপুরি দখল করে নেয় মুক্তি বাহিনী। ত্রৈলক্যবিজয় মৌজায় মুক্তি বাহিনীর বিজয় এবং হতাহতের পর যে সমস্ত মুক্তি যোদ্ধারা বিভিন্ন দিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন তাদের একত্রিত করে কর্ণেল রব, মানিক চৌধুরী, মেজর চিত্তরঞ্জন দত্তরা বিশাল বাহিনী নিয়ে শেরপুরের দিকে অগ্রসর হন। মেজর দত্ত দুজন সাহসী যুবকের খোঁজ করতে থাকেন। অবশেষে দুজন সাহসী যুবকও পাওয়া গেল একজন তৎকালীন রাজনৈতিক যুবনেতা মোঃ মুছব্বির (পরবর্তীকালে উপজেলা চেয়ারম্যান) ও সৈয়দ নাসির উদ্দিন (পরবর্তীকালে জাসদের বিপ্লবী নেতা)।

এই দুজনকে নিয়ে একটি মাছধরার নৌকা করে মেজর দত্ত শেরপুরে পাকবাহিনীর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন। নদীর এই পারে মুক্তি বাহিনী বাংকার তৈরী করে। ওই পারে পাকবাহিনী। দুই দিন মুখোমুখি অবস্থান ছিল মুক্তি বাহিনী এবং পাক বাহিনীর। অবশেষে ২রা এপ্রিল শেরপুরের প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়। ২৪ ঘন্টা স্থায়ী হয় এই যুদ্ধ। ২য় দিনের যুদ্ধে দুইজন মুক্তি ফৌজ ও পাক বাহিনীর ১৮ জন সৈন্য নিহত হয়। মুক্তি বাহিনী নদী অতিক্রম করে আক্রমণ করেছিল। পাকবাহিনীর ধারণা ছিল যে হয়তো ভারতীয় বাহিনী এসে মুক্তি যোদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়েছে। তাই পিছু হাটে সাদিপুর থেকে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করে পাক বাহিনী। সেদিনের যুদ্ধেও পাবাহিনীর সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছিল। সাদিপুর মুক্তি বাহিনীর দখলে আসে। সাদিপুর ছেড়ে পাকবাহিনী পিছু হটে রশিদপুরে যায়। সেখানে প্রথম দিনের যুদ্ধেই পাকবাহিনী হার মেনে পালায়। যাবার সময় রশিদপুর বাজার জ্বালিয়ে দেয়। পরে পাক বাহিনী আপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থান হিসেবে সিলেটের সুরমার উত্তরপাড়ে কাজির বাজারে পজিশন নেয়। মুক্তি যোদ্ধারা সুরমার দক্ষিণ পাড়ে। রেলস্টেশনের কাছে দুপক্ষের মধ্যে তুমুল লড়াই বাঁধে। 

এদিকে মুক্তিযোদ্ধারা অনেকেই তখন প্রায় অভুক্ত থেকে যুদ্ধ করছিল। ইচ্ছে থাকলেও স্থানীয় মানুষ জন খুব একটা সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারেননি। কারণ এই এলাকায় মুসলীম লীগের প্রাধান্য বেশী থাকায় স্থানীয় জনগণের সাহায্য পাওয়া যায়নি। এই সময় কিছু মুক্তিযোদ্ধা অসুস্থ হয়ে পড়ে। এদের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র, শুকনো খাবার ইত্যাদির জন্য কৈলাসহরে আসেন মৌলভী বাজারের একদল ছাত্রনেতা। তাদের সাথে এই সময় আমাকেও মৌলভী বাজারে যেতে হয়। মৌলভীবাজার গিয়েই ছাত্রনেতাদের সাথে আমাকেও মৌলভীবাজার শহরের সমস্ত বিদ্যুতের আলো নিভিয়ে দিতে হাত লাগাতে হয়। 

এদিকে পাকবাহিনী পিছু হাটে প্রথমে ৪ এপ্রিল সালুটিকর বিমান বন্দরে আশ্রয় নেয়। ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে বিমান যোগে সৈন্য ও গোলাবারুদ এসে যাওয়ায় পাক সেনারা আবার মনোবল ফিরে পায়। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের গোলা বারুদ প্রায় শূন্যের কোঠায়। কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী শত্রুর কাছ থেকে পাওয়া ওয়ারলেস সেট দিয়ে ভারতে বি এস এফ এর সাথে যোগাযোগ করেন। সেই সময় কৈলাসহরে এস পি ছিলেন কুচার সাহেব। তিনি তিন ট্রাক ভর্তি বি এস এফ জওয়ানদের পাঠালেন। আমি ও ছাত্র নেতারা যখন মৌলভী বাজারে শহরের ল্যাম্প পোষ্ট গুলোর আলো নিভিয়ে দিচ্ছিলাম তখন বি এস এফ কৈলাসহর থেকে আলীনগর হয়ে মৌলভীবাজার অতিক্রম করে। কিন্তু এদের আর ফিরে আসতে দেখা যায়নি। ভুল রাস্তায় এরা নাকি প্রায় শত্রুর মুখোমুখি হয়ে গিয়েছিল। এবং সেখান থেকে ছত্রভঙ্গ হয়েযায় দলটি। এদিকে রশিদপুরে যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী আগরতলায় মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের কাছে সংবাদ পাঠান সাহায্যের জন্য। মুখ্যমন্ত্রী শ্রী সিংহ ব্রিগেডিয়ার পান্ডের সাথে দেখা করতে বলেন। ৭ এপ্রিল কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী যথারীতি আগরতলায় ব্রিগেডিয়ার পান্ডের সাথে দেখা করেন। ৮ এপ্রিল প্রয়োজনীয় অস্ত্র গোলা বারুদ নিয়ে সুরমার পাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দেন। মুক্তিযোদ্ধারা এসব পেয়ে বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠেন। 

এদিকে মেজর সন্ড কর্ণেল রব পরিবানা তৈরী করেন কিকরে একই রাতে সিলেট শহরে প্রবেশ করে সমুদয় পাক বাহিনীকে ধ্বংস করে সিলেটকে মুক্ত করা যায়। সিলেট জেলে বন্দী মৌলভীবাজারের আওয়ামীলীগ নেতা আজিজুর রহমান এম পি এ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীরা ছিলেন। সিলেটে ঢুকেই মুক্তি বাহিনী তড়িত গতিতে জেলাখানা ভেঙ্গে সমস্ত বন্দীদের মুক্ত করে দেয়। মুক্ত হন আজিজুর রহমান। শহরে ঘোষণা করে দেওয়া হয় নাগরিকরা যেন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। এই সময় আজিজুর রহমান (এম পি এ) সহ অনেক নেতাও কর্মী কৈলাসহরে আশ্রয় নেন। কাতারে কাতারে নাগরিকেরা ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করেন। ৯ই এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধারা সিলেটে পাক সেনাদের মুখোমুখী হয়। রাত ভর যুদ্ধ চললো কিন্তু এক পাও এগুতে পারেনি পাক বাহিনী। এমন সময় হঠাৎ শুরু হলো বিমান আক্রমণ। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো মুক্তিবাহিনী। সেই সুযোগে সরিমা নদী পার হয়ে মুক্তি যোদ্ধাদের পশ্চাত্রর্তী ঘাটি আক্রমণ করলো পাক বাহিনী। 
এই ঘাঁটিটি রক্ষা করছিল সিলেটের ক্যাপ্টেন আজিজ। এটি মূলত বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি জওয়ানদের দায়িত্বে ছিল। সিলেট শহরে আটকা পড়ে মুক্তি বাহিনীর কয়েক হাজার সৈন্য। বিক্ষিপ্ত সৈন্যদের নিয়ে কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী প্রমুখ দু’তিন দিন পায়ে হেঁটে শেরপুর এসে আশ্রয় নেন। এই সময় মুক্তি ফৌজের অনেক ক্ষতি হয়, বহু অস্ত্র খোয়া যায়। অনেক মুক্তিফৌজ মারাও যায়। এমন একটা অবস্থায় মুক্তিফৌজের নেতৃত্বের মনোবলও অনেকটা ভেঙ্গে পড়ে। এমন একটি মুহূর্তে কাছাড়ের পাঁচ গ্রাম থেকে শেরপুর ছুটে যান কর্ণেল লিমায়া। তিনি কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরী, কর্ণেল রব ও মেজর দত্তদের সাথে আলোচনায় বসেন। প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে সাহায্যের আশ্বাস দেন। ব্রিগেডিয়ার পান্ডেও যোগাযোগ রক্ষা করেছিলেন। এদিকে যখন মুক্তিযোদ্ধারা আবার আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন সুনামগঞ্জে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে। ক্যাপ্টেন মুতালিব বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তার সঙ্গে বেশ কয়েকজন বাঙালি সৈন্য ছিল। ক্যাপ্টেন মুত্তালিব খাদিম নগর পর্যন্ত কমান্ডেন্ট মানিক চৌধুরীর দলকে সহায়তা করে জাফলং এর দিকে চলে যান। এই সময় গণ পরিষদ সদস্য আব্দুল হক অল্প সংখ্যক মুক্তি ফৌজ নিয়ে ছাতকে এক তুমুল সংঘর্ষে লিপ্ত হন এবং অবশেষে ছাতক পাঞ্জাবী মুক্ত করতে সক্ষম হন হক সাহেব। 

এদিকে এসময় সিলেট পুনরায় আক্রমণের প্রস্তুতির বিষয়ে এক বৈঠকে মিলিত হন মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডাররা। উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর এবং আধা সামরিক বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তা। মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের পরিচালকরা জানান যে বর্তমানে যে পরিমান মুক্তি ফৌজ এখানে রয়েছে তাদের পক্ষে সিলেট পুনরায় আক্রমন করা কঠিন হবে। তাই ঠিক হলো স্বল্প সংখ্যক, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্টের জওয়ান, কিছু মুক্তি ফৌজ এবং বি এস এফ এর সহযোগে এক যোগে পাক বাহিনীকে আক্রমন করা হবে। মুক্তি ফৌজকে দুটি মর্টার দিয়ে সাহায্য করেন কর্ণেল লিয়ামা। 

এদিকে ইতিমধ্যে সিলেটে সালুটিকর বিমান বন্দরে ঢাকা থেকে আরও সৈন্য আসে। এক ব্রিগেড পাক সৈন্য তখন বিমান বন্দরে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত। এমন সময় একদল মুক্তি ফৌজকে পাঠানো হয় সালুটিকর বিমান বন্দর আক্রমণ করে পাক সেনাদের সাথে বিমান সংযোগ বিপর্যস্ত করতে। অগ্রগামী দলটি ফাড়িপথে বিমান ঘাঁটির কাছাকাছি চলে যায় এবং ঘাঁটি লক্ষ্য করে সেল নিক্ষেপ করে। এতে সাফল্য খুব একটা না হলেও একটি বিমানের ক্ষতি হয়। বিমান ঘাঁটির ও কিছু ক্ষতি হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে এই আক্রমণের ফলে পাকসেনাদের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। মুক্তিফৌজের বাহিনীটি সালুটিকর বিমান বন্দর আপারেশন শেষ করে অক্ষত শরীরে ফিরে আসতে সক্ষম হয়। এজন্য অবশ্য ক্যাপ্টেন মুত্তালিবের ঝটিকা আক্রমণ ছিল উল্লেখযোগ্য। 

এদিকে বিমান ঘাঁটি আক্রমণের পরে পাক সেনার বুঝতে পারে বাংলার জল হাওয়ায় বেড়ে উঠা দামাল ছেলেদের সাথে ভূমি যুদ্ধে সফলতা পাওয়া কঠিন। তখন পাক বাহিনীর মধ্যে একটা আতংক ছড়িয়ে পড়ে। পুরো সিলেট জুড়ে তারা মুক্তি ফৌজের উপস্থিতির আশঙ্কায় সিদ্ধান্ত নেয় বিমান হামলার। শুরু হয় প্রচন্ড বিমান হামলা। উপরে বিমান নিচে কামানের গোলা। এর মোকাবিলায় এত অপর্যাপ্ত অস্ত্র নিয়ে একটি সুশিক্ষিত সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার যে নজির সৃষ্টি করে, সিলেটের মুক্তি বাহিনী তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। 

সূত্র- মুক্তিযুদ্ধে বৃহত্তর সিলেট ও পশ্চাৎভূমি কৈলাসহর