দেশে সবুজের রং আরো গাঢ় হইয়া উঠিতেছে

বুক ভরিয়া নিশ্বাস নেওয়ার সময় আমরা একবারও কি ভাবিয়া দেখি—কোথা হইতে আসিল এই অক্সিজেন? খাদ্যের মাধ্যমে অর্জিত শক্তির উত্স শর্করা কোথা হইতে পাইলাম—ভাবিয়া দেখিয়াছি কখনো? ক্লোরোফিলের মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া কী করিয়া তামাম উদ্ভিদজগত্ এই পৃথিবীর খাদ্যের মূল উপাদান তৈরি করিয়া যাইতেছে—তাহা কি কখনো কল্পনা করিয়া দেখিয়াছি? বিশ্বে কার্বনের পরিমাণ বাড়িয়া যাইতেছে। জলবায়ু পরিবর্তন এখন সারা বিশ্বের উল্লেখযোগ্য আলোচিত বিষয়। বলা হইতেছে তিন শত বত্সর পূর্বের প্রাক্-শিল্পবিপ্লবের যুগে যেই গড় তাপমাত্রা পৃথিবীর জন্য আদর্শিক ছিল, সেই অবস্থা ফিরাইয়া আনিতে হইবে। কিন্তু কী করিয়া তাহা সম্ভব? আমরা কি সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং শিল্পকারখানা বন্ধ রাখিব? জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান উপাদান কার্বন ডাইঅক্সাইডকে কে পারিবে শোষণ করিতে? এই সকল কিছুর উত্তর হইতেছে—‘বৃক্ষ’। গবেষণায় দেখা গিয়াছে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মানব উত্স হইতে নিঃসৃত ২৫ শতাংশ কার্বন শুষিয়া লইতেছে বন, যাহা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরির্বতন রোধে সরাসরি ভূমিকা রাখিতেছে। অর্থাত্ বিজ্ঞানের হিসাবে বিশ্বের প্রতিটি দেশ যদি নিজ নিজ দায়িত্বে বিদ্যমান বৃক্ষরাজির আয়তন চার গুণ বৃদ্ধি করিতে পারে, তাহা হইলে উন্নয়নের চাকার গতি এতটুকু না কমাইয়াও তাপমাত্রার লাগাম টানিয়া ধরা সম্ভব।

বন শুধু জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের আধারই নয়, সুপেয় পানি ধরিয়া রাখে বৃক্ষ। ফলে কোনো এলাকায় গাছের সংখ্যা কমিয়া গেলে সেইখানে মরুকরণ, ভূমিধস ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় বাড়িয়া যায়। তাহা ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের ছোবলকে প্রশমিত করিতেও বন তথা বৃক্ষরাজি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। যেমনটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলার সময় ক্ষয়ক্ষতি কমাইতে ভূমিকা রাখিয়াছিল সুন্দরবন। যদিও প্রাকৃতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ একটি জনপদে যেই ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার—বাংলাদেশের তাহা নাই। গত বত্সরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট আয়তনের ১৭ শতাংশ সম্মিলিতভাবে বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদিত এলাকা রহিয়াছে। একসময় ইহা ছিল ৯ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু সেই বিবর্ণচিত্রে সবুজের ছোঁয়া আসিয়াছে বিগত অর্ধদশকে। এমনিতেই কৃষিজমি তৈরি এবং কাঠের জন্য বন কাটিবার ঘটনা বৃদ্ধি পায় ব্রিটিশ জামানাতেই। আবহমানকাল ধরিয়াই আমাদের গ্রামীণ জীবন সম্পূর্ণতই বৃক্ষের উপর নির্ভরশীল। বসবাসের বিভিন্ন কাঠামো হইতে শুরু করিয়া রান্নার প্রয়োজনেও বৃক্ষ কাটিবার বিকল্প নাই। ইহাই বাস্তবতা। কিন্তু এই গাছ কাটিবার পাশাপাশি যদি আরো অধিক সংখ্যায় বৃক্ষ রোপণ করা যায়, তাহা হইলে সামগ্রিক চিত্র কখনই বিবর্ণ হইবে না। এইখানেই সামাজিক বনায়নের বিশেষ গুরুত্ব রহিয়াছে—যাহা বিগত কয়েক বত্সরে ব্যাপক পরিসরে ছড়াইয়া দেওয়া হয় দেশ জুড়িয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলায় দেশের নাগরিকদের গাছ লাগাইবার আহ্বান জানাইয়াছেন। পরামর্শ দিয়াছেন, প্রত্যেকেই নিজের কর্মস্থল ও বাসস্থানে গাছ লাগাইবার। তিনি বলিয়াছেন যে—অন্তত, একটি করিয়া বনজ, ফলদ ও ভেষজ গাছ লাগাইবার পাশাপাশি আমাদের ছেলেমেয়েদেরও বৃক্ষরোপণ শিখাইতে হইবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় আমাদের লাল-সবুজের দেশে সবুজ রংটি আরো গাঢ় হইয়া উঠিতেছে, ছড়াইয়া পড়িতেছে দিকে দিকে। ইহা অত্যন্ত আনন্দের।