১৮ বছর ধরে চলেছে মামলার বিচার কাজ। এছাড়া দুই দফায় পুলিশি তদন্তে কেটে গেছে এক বছর। এরপর পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন সূত্রে জানা হল, আসামিরা নয়, মামলার বাদীই নিজ সন্তানের হত্যাকারী। প্রতিবেশীদের ফাঁসাতে সন্তানকে হত্যার করে দুই স্ত্রীকে নিয়ে এমন নাটক সাজিয়েছিলেন।
তবে সন্তান হত্যার ১৫ বছর পর মামলার বাদী আকসেদ আলী সিকদার মারা যান। আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনেন তদন্তের পর বাদীর দুই স্ত্রী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারক্তিমূলক জবাববন্দি দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) রাজশাহী অফিসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এমন তথ্য দেন পিবিআই রাজশাহীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আযাদ।
তিনি বলেন, প্রায় ১৯ বছর আগে ২০০৪ সালের ১০ জুন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার লক্ষ্মীনগর এলাকায় ১৩ বছরের শিশু রেবেকা খাতুনকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় একই গ্রামের প্রতিপক্ষ মোল্লা বংশের ২০ জনকে আসামি করে বাঘা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন শিশুটির বাবা আকসেদ আলী সিকদার। যদিও মামলার তদন্তের শেষ পর্যায়ে উঠে এসেছে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে আকসেদ আলী নিজেই ১৩ বছরের সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছিলেন।
সংবাদ সম্মেলন বলা হয়, বাদী আকসেদ আলী সিকদার পুলিশের কাছে স্বীকারক্তি দিয়েছিলেন- ঘটনার রাতে ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে তিনি দুই স্ত্রী ভায়েলা খাতুন ও আফিয়া বেওয়ার সঙ্গে বসে গল্প করছিলেন। একপর্যায়ে তারা জানতে পারেন আনুমানিক ৫০ জন দুষ্কৃতকারী তার বাড়ির দিকে আসছে। এ সময় স্ত্রীর পরামর্শে আকসেদ আলী বাড়ির কিছু দূরে একটা মাঠিয়ালে (ছোট পুকুর) গিয়ে লুকিয়ে পড়েন। এ সময় দুুষ্কৃতকারীরা তার বাড়িতে হামলা চালায়। দুষ্কৃতিকারীরা তার বাড়ি থেকে চলে গেলে কিছুক্ষণ পরে তিনি বাড়ি ফিরে এসে দেখেন তার স্ত্রীর হাত রক্তাক্ত এবং ছুরিকাঘাতে তার ১৩ বছরের শিশু কন্যা রেবেকা খাতুনের পেটের থেকে নাড়ি-ভুড়ি বের হয়ে গেছে। তাদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে রেবেকার মাথায় পানি দেওয়া অবস্থায় ঘটনাস্থলে রেবেকা মারা যায়।
পরে মেয়েকে হত্যার দায়ে বাঘা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন আকসেদ আলী সিকদার। মামলায় ২০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ২০/২৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলাটি প্রথমে বাঘা থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরে মামলাটি রাজশাহী জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) শাখা তদন্ত করে একই বছরের ৩০ নভেম্বর আদালতে এজাহার নামীয় ২০ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। মামলাটি রাজশাহীর জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী আদালতে ১৮ বছর ধরে বিচার কার্যক্রম চলে। পরে আদালত মনে করে মামলটি আরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাই ২০২২ সালের ১৬ মে রাজশাহী পিবিআইকে মামলাটি অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন আদালত।
এরপর পিবিআই তদন্ত শুরু করে। তবে তদন্তকালে পিবিআইয়ের কাছে একটা বড় প্রশ্ন ছিল। গ্রাম্য জায়গায় রাত সাড়ে ১১টা গভীর রাত। এ সময় ৫০ জন লোক এসে একটা ১৩ বছরের মেয়েকে মেরে চলে গেল। আর বাড়ির টিনে মাত্র দুইটি কোপের চিহ্ন ছিল। এটা কতটা বাস্তব। এই প্রশ্নকে সামনে রেখে মামলাটির তদন্ত শুরু করে পিবিআই রাজশাহীর উপ-পরিদর্শক (এসআই) নিরস্ত্র খায়রুল ইসলাম।
তদন্তের একপর্যায়ে বাদী আকসেদ আলী সিকদারের স্ত্রী ভায়েলা খাতুন ও নিহত রেবেকা খাতুনের মা আফিয়া বেওয়া আদলতে ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত জবানবন্দিতে স্বীকার করেন আসামিদের ফাঁসানোর জন্য তাদের স্বামী আকসেদ আলী সিকদার নিজ শিশু সন্তানকে (রেবেকা) হত্যা করেন। খুনের সময় বাধা দিতে গেলে তার দুই স্ত্রীর হাতের বিভিন্ন জায়গায় কোপ দেওয়া হয়। এরপর দুই স্ত্রীকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য প্রতিপক্ষের ২০ জনকে ফাঁসাতে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। যদিও তাদের নিজেদের মধ্যে জায়গা জমি নিয়ে দীর্ঘ দিনের মামলা চলমান রয়েছে।
পিবিআই রাজশাহী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল কালাম আযাদ আর বলেন, তারা আদালতের কাছে স্বেচ্ছায় ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, স্বামী আকসেদ আলীই তার মেয়েকে হত্যা করেছেন। যদিও আসামি আকসেদ আলী মারা গেছেন। আসামির দুই স্ত্রী এখন এই মামলার সাক্ষী।