১৯৯২ সালে রাজধানীর নয়াটোলায় খুন হন মনির। মেয়েদের উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় তাকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। নিহতের ভাই মঞ্জুর হোসেন খান রমনা থানায় মামলা করেন। ২০০১ সালে পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়। সাক্ষীদের সাক্ষ্য দিতে ৯০ বার দিন ধার্য করা হয়, কিন্তু রাষ্ট্রপক্ষ ১৩ জনের মধ্যে মাত্র চার জন সাক্ষী হাজির করতে সক্ষম হয়। তবে মামলার বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা, ময়নাতদন্তকারী চিকিত্সক, লাশের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুতকারী পুলিশ সদস্যসহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে যাননি আদালতে। সমন ছাড়াই জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেও হাজির করা যায়নি তাদের। নেই খুনের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। ফলে সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে খুনের মামলা থেকে পাঁচ আসামিকে খালাস দিয়ে গত ২২ মার্চ রায় দেন বিশেষ দায়রা জজ ও ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩-এর বিচারক মো. মনির কামাল। একই আদালত থেকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে খালাস পেয়ে যান আরমানিটোলার কামরুজ্জামান হত্যা মামলার ছয় আসামি। সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ১১০ বার দিন ধার্য করা হয়। ২০ জনের মধ্যে মাত্র ছয় জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাতে রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি প্রমাণে সক্ষম হয়নি বিধায় সব আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। এভাবেই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের সাক্ষ্যের অভাবে রাজধানীতে খুনের ৪৬টি চাঞ্চল্যকর মামলার চার্জশিটভুক্ত ২০০ আসামির সবাই খালাস পেয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩-এর বিচারক মো. মনির কামালের দেওয়া পৃথক পৃথক রায়ে খালাস পান আসামিরা। অধস্তন আদালতের ওয়েবসাইটে স্থান পাওয়া এসব রায় পর্যালোচনা শেষে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
খুনের এসব ঘটনা ১৯৯১ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত হয়েছে। কাউকে গুলি করে, কাউকে আবার কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে আসামিরা। তদন্তে খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পেয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা যাননি আদালতে সাক্ষ্য দিতে। আবার আটটি খুনের মামলায় এক জন সাক্ষীও সাক্ষ্য দেননি। ফলে দুই দশকের বেশি সময় ধরে এসব মামলা পড়ে ছিল আদালতে। বিষয়টি হাইকোর্ট বিভাগের নজরে আসায় এসব মামলা নিষ্পত্তির জন্য সময় বেঁধে দেয়। ফলে ট্রাইব্যুনালের বিচারক যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে তার ভিত্তিতে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করে রায় দেন।
এভাবে একের পর এক স্পর্শকাতর খুনের মামলায় আসামি খালাসের ঘটনা প্রসঙ্গে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ইত্তেফাককে বলেন, এতগুলো খুনের পুরোনো মামলায় শত শত আসামি খালাসের ঘটনায় আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দুর্বলতাই প্রকাশ পেয়েছে। এই বিচারব্যবস্থার দুর্বলতম দিক হচ্ছে তদন্ত, প্রসিকিউশন, বিচারকের অপ্রতুলতা। জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত কর্মকর্তাদের দক্ষ করে তুলতে না পারলে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কার্যকর ফল বয়ে আনবে না। কারণ এ ধরনের মামলার মূল জায়গা হচ্ছে তদন্ত। এখানে গলদ থাকলে বিচারক ও প্রসিকিউশনের কিছুই করার থাকে না। এজন্য মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তাদের দিয়ে মামলার তদন্ত করাতে হবে। বেতন-ভাতা যথেষ্ট পরিমাণে বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, ‘সাক্ষীরা কোর্টে সাক্ষ্য দিতে আসেন না—এটা ঠিক নয়। মামলার শুরুর দিকে তারা ঠিকই আদালতে আসেন। যখন দিনের পর দিন আদালতে এসে সাক্ষ্য দিতে না পেরে ফিরে যান, তখন হতাশায় ভোগেন। একসময় সাক্ষ্য দিতে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। পিপিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। জবাবদিহি থাকলে নিশ্চয় ফৌজদারি মামলায় ভিন্ন ফল দেখতে পেতাম।’
খালাসের উল্লেখযোগ্য মামলাসমূহ
১৯৯৮ সালে মহাখালীতে খুন হন আকরাম। নিহতের মা আয়েশা খাতুন গুলশান থানায় এজাহার করেন। তিনিসহ রাষ্ট্রপক্ষের ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য দিতে ১৯০ বার দিন ধার্য হয়। মাত্র এক জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দেন। বাকিরা আদালতমুখী হননি। নেই প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীও। অনুপস্থিত ছিলেন ফরমাল সাক্ষীরা। ফলে ২৪ বছর পর চার্জশিটভুক্ত চার আসামি খালাস পান।
একই বছরের ২০ সেপ্টেম্বর ডেমরায় খুন হন ফেরদৌস। ১৯ জনের মধ্যে তিন জন সাক্ষ্য দেন, খালাস দেওয়া হয় ১৩ আসামিকে। ২০০০ সালে মোহাম্মদপুরে মিন্টু হত্যা মামলায় ১৯ জনের মধ্যে সাত জন সাক্ষ্য দেন, খালাস পান ১২ আসামি। ১৯৯৮ সালে মতিঝিলে শিশু আওলাদ হত্যা মামলায় ২০ জনের মধ্যে একজন সাক্ষ্য দেন, খালাস পান আট আসামি। ২০০০ সালে ক্যান্টনমেন্টের মাটিকাটায় হাশেম হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দেন ১৮ জনের মধ্যে তিন জন, খালাস পান আট জন। ১৯৯৯ সালে শ্যামপুরে ভুট্টো হত্যা মামলায় ২৮ জনের মধ্যে সাক্ষ্য দেন এক জন, খালাস পান সাত আসামি। পল্লবীতে ২০০০ সালে মনিরুজ্জামান হত্যা মামলায় ২৫ জনের মধ্যে সাক্ষ্য দেন তিন জন, খালাস পান আট আসামি। ১৯৯৯ সালে মালিবাগের চৌধুরীপাড়ায় কায়েস হত্যা মামলায় ১৭ জনের মধ্যে পাঁচ জন সাক্ষ্য দেন, খালাস পান ছয় আসামি। মিরপুরে ২০০০ সালে রঞ্জু হত্যা মামলায় ১৪ জনের মধ্যে একজন সাক্ষ্য দেন, খালাস পান সাত আসামি। ২০০০ সালে শ্যামপুরে জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় ১৮ জনের মধ্যে পাঁচ জন সাক্ষ্য দেন, খালাস পান আট আসামি। ২০০০ সালে ওয়াইজঘাটে হামিদ হত্যা মামলায় ১৩ জনের মধ্যে দুই জন সাক্ষ্য দেন, খালাস পান সাত আসামি। এভাবে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা সাক্ষ্য না দেওয়ায় কলাবাগানে মন্টি হত্যায় পাঁচ জন, রূপনগরে লোকমান হত্যায় পাঁচ জন, ডেমরায় হাসান হত্যায় ছয় জন, খিলগাঁওয়ে পান্না হত্যায় ছয় জন, সেনপাড়ায় লেবু হত্যায় তিন আসামিকে খালাস দেন বিচারক।
মামলাগুলোর রায়ে বিচারক বলেছেন, হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনা রয়েছে, ২০০০ সালের পূর্বের মামলাসমূহ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। এমতাবস্থায় প্রসিকিউশন পক্ষ এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত খুনের অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন, তাই আসামিদের খালাস দেওয়া হলো।
রায় পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০ বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকার আদালতে বিচারাধীন এসব মামলায় সাক্ষী হাজিরার তারিখ পড়েছে, কিন্তু পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে সাক্ষী হাজির করতে। সাক্ষী হাজির করতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রসিকিউশনও মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তিতে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে যুগ যুগ ধরে মামলা পড়ে ছিল আদালতে। এভাবে বিচারের বিলম্বে হারিয়ে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা। আবার সাক্ষীদের ঠিকানা পরিবর্তিত হওয়ায় সঠিক স্থানে পৌঁছায়নি সমন। ফলে সাক্ষী হাজিরে সমন ও জামিন অযোগ্য পরোয়ানা জারি করেও কোনো ফল মেলেনি। বিচারের এই ধীরগতিতে নীরবেই অশ্রু ঝরিয়েছেন খুনের শিকার পরিবারগুলোর সদস্যরা। যেখানে বিচারের আশায় পথ চেয়ে ছিলেন কারো বাবা-মা, কারো ভাই বা বোন, আবার কারো সন্তান ও স্ত্রী, কিন্তু খালাসের রায়ে এসব খুনের মামলায় বিচার পাওয়ার আশা শেষ হয়ে গেছে তাদের।
এ প্রসঙ্গে সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ নূরুল হুদা ইত্তেফাককে বলেন, খুনের মামলায় সাক্ষী হাজির করা না গেলে আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। সাক্ষ্য আইনে রয়েছে, ফরমাল সাক্ষীদের কোর্টে এসে সাক্ষ্য দিতে হবে। এরা মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ফরমাল সাক্ষীদের দেওয়া প্রতিবেদনের ওপর পুরো মামলার ভবিষ্যত্ নির্ভর করে। তিনি বলেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের মনোভাব থাকে খুনের বদলা নিতে হবে। সেজন্য তারা বিচারের শুরুতে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী হন। কিন্তু যখন বছরের পর বছর চলে যায়, বিচার শেষ হয় না, তখন সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তখন খালাসের রায় দেওয়া ছাড়া বিচারকের সামনে আর কোনো উপায় থাকে না।
খুনের আট মামলায় সাক্ষ্য দেননি একজনও
১৯৯৭ সালে সূত্রাপুরে সোহেল, ১৯৯৮ সালে সবুজবাগে মাসুম, ১৯৯১ সালে মতিঝিলে সিরাজ, ১৯৯৮ সালে মোহাম্মদপুরের সরোয়ার ও ফরিদ, ২০০০ সালে সূত্রাপুরে সেলিম, ১৯৯৭ সালে তেজগাঁওয়ে শফিক, দনিয়ায় বোরহান হত্যা মামলায় একজন সাক্ষীও আদালতমুখী হননি। ফলে ফৌজদারি কার্যবািধির ২৬৫(জ) ধারায় সমাপ্ত করে ২৩ আসামিকে খালাস দেন বিচারক। এই আট মামলার সাক্ষীদের হাজিরার জন্য ৫৬১ বার দিন ধার্য করেছিল আদালত।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুনের মামলার আসামিরা প্রভাবশালী বা সন্ত্রাসী প্রকৃতির হন। সাক্ষীরা যেন আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য দিতে না পারেন, সেই চেষ্টাই তাদের থাকে। এজন্য নানা কৌশলের আশ্রয় নিয়ে সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখান। প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। ফলে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আদালতে যান না। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোনো মামলায় যদি একজন নির্ভরযোগ্য সাক্ষীও পাওয়া যায় এবং সেই সাক্ষীর সাক্ষ্য আদালতের কাছে নির্ভরযোগ্য ও সত্য বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে মামলা প্রমাণ করার সুযোগ রাষ্ট্রপক্ষের রয়েছে। সাক্ষীর অভাবে চার্জশিটভুক্ত আসামিদের এভাবে খালাস পাওয়ার ঘটনা ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে নতুন করে ভাবনার খোড়াক জোগাবে।