জীবনের পাঁচটি মৌলিক বিষয়ের অন্যতম একটি চিকিত্সা। আহার-বস্ত্র-বাসস্থান-লেখাপড়া কোনো কিছুই কিছু নয়, যদি শরীর ভালো না থাকে। শরীর ভালো থাকাটা সব সময় মানুষের নিজের হাতে থাকে না। এটা মানি— নিয়ম মানলে, সঠিক খাবার খেলে, পর্যাপ্ত নিদ্রা হলে আর পাশাপাশি পরিবেশ ভালো থাকলে মানুষ দীর্ঘায়ু হয়। কিন্তু সব সময় যে তা তাও কিন্তু নয়। শরীর খারাপের অনেক কারণ থাকে। আজকের দুনিয়া প্রতিযোগিতার দুনিয়া। সহজ জীবন বা সরল-জীবন এখন ইতিহাস। করপোরেট বাণিজ্য পুঁজিবাদের প্রভাব অসম প্রতিযোগিতায় মানুষ দিশেহারা। বাংলাদেশের প্রকৃতিগত পরিবেশ জনসংখ্যা আর মানসিক চাপের দিক ভয়াবহ। বিদেশে অনেক মানুষ চরম বিস্ময়ে জানতে চায় ঐটুকু দেশে ১৭ কোটি মানুষ থাকে কী করে? কেউ কেউ চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করে ক্রিকেট? খেলো কোথায় তোমরা? একবার এক অজি আমাকে চেপে ধরেছিল বলতে, মানুষ কি লম্বা হয়ে ঘুমাতে পারে বা পাশাপাশি? বেচারা কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, তার দেশের একটি রাজ্যের চেয়েও ছোট এক দেশে কোটি কোটি মানুষ কীভাবে বসবাস করে?
আমাদের এই দেশে মানুষ কত কারণে যে অসুস্থ হয়। খাবারে ভেজাল দেওয়া আমাদের জাতীয় রোগ। দেশের বড় বড় শহরে কে কী খাচ্ছে আর কেন খাচ্ছে নিজেরাও জানে না। মিষ্টি সবজি আনাজ থেকে বিস্কুট কিছুই ভেজালের বাইরে নয়। ভেজাল কত প্রকারের আর কত জঘন্য হতে পারে তা বাংলাদেশের ভেজাল না জানলে বোঝা যাবে না। এমন সমাজে মানুষ খাবারের বিষক্রিয়ায় নীরবে মারা যায়। বেশিরভাগ মানুষ বহন করে কঠিন যত রোগ। রোগের প্রকোপ যত বেশি তত চিকিত্সা ও চিকিত্সকের কদর। দেশের ডাক্তারদের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা রেখেই বলি তাদের প্রতি মানুষের বিশ্বাস বড় কম। তা না হলে মানুষ দলে দলে দেশের বাইরে যেত না। শুধু কি আমজনতা? দেশের যত বড় বড় মানুষ, আমলা থেকে নির্বাহী সবাই চিকিত্সার জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়। ব্যাপারটা এমন, নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের জন্য ভারত; উচ্চবিত্তের জন্য সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ড আর ধনীদের জন্য ইউরোপ আমেরিকা কিংবা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ। ভারতেও ভাগ আছে। বেশিরভাগ মানুষ চেন্নাই-বেঙ্গালুরুমুখী। দেশে কিংবদন্তিতুল্য কোনো ডাক্তারের নাম জিগ্যেস করলে এখন কেউ নিশ্চয়ই কোনো নাম বলতে পারবে না। কারণ তেমন ডাক্তার জন্মায় না আর। মানুষ সাধারণ চিকিত্সকদের কাছে যেতেও ভালোবাসে। কিন্তু তার পরও তারা খুব কম ডাক্তারের কাছ থেকে সুমতামত বা ভালো ব্যবহার পায়। বেশিরভাগ হয়রানি আর অপমানের কেচ্ছা।
সামাজিক মিডিয়া বিশেষত ফেসবুক আসার পর জীবন থেকে ঘুম চলে গেছে মানুষের। সময়ের ব্যবধানে আমরা চার ঘণ্টা এগিয়ে তাই সিডনির ভোর মানে বাংলাদেশের মধ্যরাত। আমি অবাক হয়ে দেখি বিডি টাইম রাত ৩টা-৪টায় সবাই জেগে। তখনই যেন মূলত জমে ওঠে চ্যাট আড্ডা বা কথাবার্তা। রাত ১২টার পর সেদিনের টকশো হয় বিভিন্ন চ্যানেলে। এটা তো আসলে একটা বিরাট ভুল। রাত ১২টার পর মানে তো আরেকটা দিনের শুরু। তাছাড়া গভীর রাতে মানুষকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বা ঘুম যেতে না দিয়ে গরম গরম কথা উষ্ণ তর্ক শোনানো বা দেখানো কতটা উপকারী? বিজ্ঞানের ন্যূনতম জানা থাকলেও বোঝা সহজ এসব শুনে মগজ গরম মাথা গরম হলে ঘুম টুটে যেতে বাধ্য। কিন্তু কে শোনে কার কথা? এটাই দস্তুর। যত রাত তত এসব আর আড্ডার নামে রাত্রি জাগরণ। এভাবে মূলত সামাজিক শৃঙ্খলা তো গেছেই শরীর ও গেছে মানুষের।
সমাজের বিভিন্ন দিকে যে হতাশা আর অবিশ্বাস তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে চিকিত্সার সমস্যা। চিকিত্সকদের ব্যবহার ভুল চিকিত্সা অযত্ন আর রাজনীতি সব মিলে এক বৈরী পরিবেশ। মানুষ এ জায়গায় বড় অসহায়। নাক কান গলার চিকিত্সক কথা বলেন না। ক্যানসারের চিকিত্সক ভরসা দেন না সাধারণ ডাক্তার ছুঁয়েও দেখেন না। মানুষ তবে যাবে কোথায়? আর আমরা এ সমাজে ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি রুম থেকে বেরিয়ে এসে সঙ্গে করে চেম্বারে নিয়ে যান। সুন্দর করে কথা বলেন আর যত সময় থাকি তত সময় মনে হয় কোনো বন্ধু বা প্রিয়জনের সঙ্গে আছি। এগুলো আমরা করতে জানি। কিন্তু করব না, এটাই যেন প্রতিজ্ঞা।
সে কারণে পাশের দেশের ডাক্তাদের প্রয়োজন হয়। তাঁরা এসে আমাদের উদ্ধার করেন। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলি, আমাদের শক্তি আমাদের উত্স আমাদের বর্তমানকে আমরা যদি সেভাবে ব্যবহার না করি মানুষের বিদেশ যাওয়া বন্ধ হবে না। আর আমরা দেশে শক্তিশালী চিকিত্সাব্যবস্থাও গড়ে তুলতে পারব না। অথচ বাঁচার বাহন হলো চিকিত্সা।
n লেখক :সিডনি প্রবাসী লেখক