শিক্ষা নিয়ে এদেশে অতীতেও বহু জরিপ, বহু গবেষণা, পর্যালোচনা হয়েছে, এখনো হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। তবে বর্তমানে শিক্ষার যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে, তা একটা জাতির জন্য সত্যিই ভয়াবহ। গবেষণালব্ধ ফলাফলটা হচ্ছে— শিক্ষাক্ষেত্রে পাসের হার বাড়ছে, কিন্তু মান নেমে গেছে হিমাংকেরও নিচে! এ হার বৃদ্ধিতে জয় কে পেল? শিক্ষার্থীরা? কখনোই না। পেল অসাধু, অর্থলোলুপ শিক্ষকরা, প্রশ্ন ফাঁসকারী কুলাঙ্গাররা আর কোচিং ব্যবসায়ীরা। গর্বে তাদের নিশ্চয়ই বুক ফুলে উঠেছে, কারণ তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টায়ই তো ঘরে ঘরে সব শিক্ষিত হয়ে উঠছে, একের পর এক পাশ দিয়ে সনদধারী হচ্ছে। কিন্তু এ যে শুভংকরের ফাঁকি, তার প্রমাণ মেলে যোগ্যতার প্রশ্নে, দক্ষতার প্রশ্নে, সেখানে শূন্য কলসি ঠনঠন করে বাজে।
তাই প্রকৃত শিক্ষায়, এজন্য অত্যন্ত দক্ষতা ও সতর্কতার সঙ্গে কতগুলো নিয়মনীতি প্রবর্তন করতে হবে, যা সম্পূর্ণই গতানুগতিক শিক্ষাপদ্ধতি থেকে আলাদা। যেমন— শিশুশ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত প্রতি শিক্ষার্থীর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আর শিক্ষকদের লক্ষ রাখতে হবে, প্রতি শিক্ষার্থী বিষয়বস্তু সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে পারল কি না সেদিকে। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই দায়সারা হওয়া চলবে না। এজন্য অবশ্য শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দিনক্ষণ ঠিক করে পরীক্ষা না নিলেও চলবে। পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই মূল্যায়ন করতে হবে কে কতটা আয়ত্ত করতে পারল। আর তার ওপর ভিত্তি করেই মান যাচাই করতে হবে, ফলে মেধাক্রমও জানা হয়ে যাবে।
অনেক দেশেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নির্ধারিত পরীক্ষা ছাড়াই মূল্যায়ন করা হয়। আমাদের দেশেও এটা করা যেতে পারে। ফলে পরীক্ষাভীতি শিক্ষার্থীদের আর তাড়া করে ফিরবে না; বরং বিষয়বস্তু আয়ত্ত করতে করতে এদের ভেতটা অনেক দৃঢ় ও মজবুত হয়ে যাবে।
প্রতি মাসে একটা তদন্তকারী দল প্রতি প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে। কতটা অগ্রগতি হলো তা নিরূপণ করার জন্য। এ কাজে শিক্ষিত বেকার যুবক/যুবতি/অবসরপ্রাপ্ত কর্মক্ষম শিক্ষকদের কাজে লাগাতে হবে। এতে অসহনীয় বেকার সমস্যার অনেকটাই সুরাহা হবে। একটা মানসম্মত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এ কাজ করতে হবে। এদের কাজ হবে প্রতি শিক্ষার্থীর মান যাচাই করা, সাধারণ জ্ঞানের পরিধি বাড়ানো, সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানের কিছু মজার মজার পরীক্ষা করে দেখানো। আর ছয় মাস অন্তর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে কোনো দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনে যাওয়া। ফলে সম্পূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাই একটা ফলপ্রসূ ও আনন্দঘন পরিবেশের আওতায় চলে যাবে। নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির কোনো ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া চলবে না। সারা বছর ব্যবহারিক বিষয়গুলো হাতে-কলমে শেখাতে হবে এবং পূর্ণ নম্বর দিতে হবে।
বহুনির্বাচনীর জাঁতাকল থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিতে হবে। তবে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের যাচাই প্রতি সপ্তাহে পঠিত বিষয়ের ওপর শ্রেণিকক্ষেই সম্পন্ন করতে হবে।
এভাবে যদি শিক্ষাপদ্ধতি চালনা করা যায়, আমার স্থির বিশ্বাস, শিক্ষাজগতে একটা যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হবে। অসার পদার্থে নয়, প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে এদেশের সকল শিক্ষার্থী। যোগ্যতা ও দক্ষতার বিচারে থাকবে সবার ওপরে। সেরার সেরা হয়ে উঠবে বিশ্বদরবারে।
n লেখক :অবসরপ্রাপ্ত প্রভাষক, বাউফল সরকারি কলেজ, বাউফল, পটুয়াখালী