অবৈধ পথে ইউরোপে পাড়ি জমাতে গিয়ে দুবাইয়ে বন্দি হয়ে শতাধিক যুবক বিভীষিকাময় জীবন পার করছেন। দিনের পর দিন আটকে রেখে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করা হচ্ছে। দেওয়া হচ্ছে না খাদ্য। এমনকি গোসলও করতে পারছেন না তারা। সব মিলিয়ে দুর্বিষহ জীবন-যাপন করছেন তারা। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে একজন মারাও গেছেন। যারা এখনো জীবিত আছেন তারা বাঁচার আকুতি জানিয়েছেন। তাদের ওপর নির্যাতনের চিত্র ও বাঁচার আকুতি জানিয়ে একটি ভিডিও বার্তা ইত্তেফাকের কাছে পাঠিয়েছেন তারা। সন্তানের নির্যাতনের চিত্র দেখিয়ে অভিভাবকদের কাছ থেকে আদম ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। এসব ঘটনার পর মাঝে মাঝে জড়িত অনেক আদম ব্যবসায়ী গ্রেফতার হয়, আবার জামিনেও বেরিয়ে আসে। কিন্তু আদম পাচার বন্ধ হয় না। এই অবৈধ ব্যবসা এখন প্রকাশ্যে চলছে। অভিভাবকরা এই আদম পাচারের নিষ্ঠুর পরিণতি জেনেও তাদের সন্তানদেরকে পাঠাচ্ছেন। এই বিষয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও সচেতনতা থাকতে হবে বলে মনে করেন মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন সংঘটনের নেতৃবৃন্দ। সেই সঙ্গে আদম পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করলে এই অবৈধ মানবপাচার রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।
দুবাইয়ে আটকে পড়া এই শতাধিক যুবককে ইতালি, স্পেন, গ্রিস, ফ্রান্স, তুরস্কসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন ঢাকার ফকিরাপুলের আহসান উল্লাহ নামের এক আদম ব্যবসায়ী। তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে ৮ লাখ থেকে ১০ টাকা নিয়েছিলেন। তাদের উপর এই অমানবিক নির্যাতনের কথা জানতে পেরে ওই যুবকদের স্বজনরা গিয়েছিলেন ফকিরাপুলে আহসান উল্লাহর অফিসে। সেখানে আহসান উল্লাহ উল্টো তাদের হুমকি দিয়েছেন। বেশি কথা বললে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। স্বজনরা জানান, তারা সেই অফিসে গিয়ে দেখেন, সেখানে পুলিশ সদস্যরা বসে আহসান উল্লাহ’র সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছেন।
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া আমাদের দেশের বেকার যুবকদের দীর্ঘদিনের প্রবণতা। বড় স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন অনেকে। তবে সেই স্বপ্নের যাত্রা একসময় মৃত্যুর শোকে মলিন হয় প্রিয়জনদের কাছে। অবৈধ পথে ইউরোপে যাত্রা করে লাশ হন অনেক তরুণ। আর দেশে স্বজনরা কাটান দুঃসহ জীবন। সীমান্ত দিয়ে মালয়েশিয়ার যাওয়ার পথে জঙ্গলে আটকা পড়েন অনেক যুবক। পরে সেখানে শত শত মানুষের হাড় কঙ্কাল পাওয়া যায়। ভাগ্যান্বেষণে বৈধ পথে বিদেশ যান যত বাংলাদেশি, তার কয়েকগুণ বেশি যান অবৈধ পথে। দুর্গম সেই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে শত শত মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। এসব প্রাণহানি আর রোমহর্ষক ঘটনার খুব সামান্যই আমরা জানতে পারি। তাই অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া বন্ধ করা উচিত বলে মনে করেন সচেতন মহল। এর আগে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সময় মুক্তিপণের জন্য লিবিয়ায় বন্দি হয়ে নির্মম নির্যাতনের শিকার তরুণদের পরিবারগুলোর কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ হারিয়েছেন ভাই, কেউ হারিয়েছেন স্বামী। মুক্তিপণ দিয়ে স্বজনকে দেশে ফেরানোর আশায় হারিয়েছেন নিজের শেষ সম্বলটুকুও। বিভিন্ন দরিদ্র লোকজনকে টার্গেট করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে হাতিয়ে নেওয়া হয় লাখ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ থেকে দালালের মাধ্যমে দুবাই হয়ে ইউরোপ যাওয়ার আগে মরক্কো, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, ইরান ও আলবেনিয়ার মতো দেশগুলোতে ঢুকছেন তারা। আর ভয়ঙ্কর ঝুঁকির এই যাত্রাপথে তাদের অনেকেই মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে পাসপোর্ট, টাকাপয়সা সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। শিকার হচ্ছেন অমানুষিক নির্যাতনের। অনেক ক্ষেত্রেই তাদেরকে জিম্মি করে দেশে স্বজনদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মুক্তিপণ। ভয়ঙ্কর এসব ফাঁদ থেকে কোনোমতে মুক্তি মিললেও তাদের দেশে ফেরার পথ আর সেভাবে খোলা থাকে না। সব হারিয়ে ফেরার কোনো উপায় না দেখে আবার তারা পা বাড়াচ্ছেন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর দিকে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর ও পারস্য উপসাগর পাড়ি দিয়ে পৌঁছাচ্ছে গ্রিস, স্পেন, ইতালি ও তুরস্কের মতো দেশে। অভিবাসন বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে অবৈধভাবে প্রবেশ করার জন্য ১৮টির মতো পথ ব্যবহার হয়। দুর্গম মরুভূমি ও গভীর সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছাতে প্রতিবছর বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। গ্রেফতার হয়ে জেল খাটতে হচ্ছে অনেককে।
র্যাবের মহাপরিচালক এম খুরশীদ হোসেন বলেন, বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে বিপদে পড়া মানুষদের স্বজনদের কাছ থেকে প্রচুর অভিযোগ আসছে। অবৈধ পথে বিদেশ পাঠানোর ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবে র্যাব। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক মো. শহীদুল আলম বলেন, ‘যে যায় দায় তারই। সে জেনেবুঝে টাকা দিয়ে ভিজিট ভিসা নেয়। কাজ দেওয়ার কথা বলেই তাদের দুবাই নেওয়া হয়। এরপর কাজ না পেলে তারা যে পথে পা বাড়ায়, তার দায় তাদেরই।’