চিনি নয়, উপজাতেই মুনাফা আনছে কেরু

আখ থেকে যে এত কিছু হতে পারে, তা দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানিতে না গেলে বোঝা সম্ভব নয়। চিনি বিক্রি করে লাভ না করতে পারলেও আখের রস থেকে চিনি বানানোর পরও সেখান থেকে তৈরি হচ্ছে চিটাগুড়, বায়োফার্টিলাইজার, ভিনিগার, বিশ্বমানের লিকার ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার। এসব উৎপাদিত পণ্য বিক্রির পরিমাণ ৩৬৭ কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব ও অন্যান্য লোকসান সমন্বয় করে কেরু কোম্পানি মুনাফাও করেছে।

প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, হাইব্রিড জাতের আখ চাষ বাড়ানো গেলে কেরু কোম্পানির আয় অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। তবে কর্তৃপক্ষ এও বলছে শুধু লাভের হিসাব করলে চলবে না, প্রতিষ্ঠানটিকে আরও লাভজনক করে তুলতে কারখানা ও মেশিনের আধুনিকীকরণও জরুরি।

ebcff3f8678b06f4965a806861c8ecdfcbbc27650ed08156

আখ থেকে চিনি বের করে নেওয়ার পর তিনটি উপজাত থাকে—মোলাসেস বা চিটাগুড়, ব্যাগাস বা ছোবড়া, প্রেসমাড বা গাদ। প্রেসমাড ও গাদের সঙ্গে স্পেন্টওয়াস বা বর্জ্য পানি দিয়ে বায়োফার্টিলাইজার উৎপাদন করা হয়। কেরুর উৎপাদিত ভিনেগারের বাজারে ব্যাপক চাহিদা। আর মোলাসেসই লিকার উৎপাদনের মূল উপকরণ। উপজাত দ্রব্যগুলো প্রক্রিয়া করে কান্ট্রি স্পিরিট লিকার, রেক্টিফাইট স্পিরিট, এক্সটা নিউট্রা অ্যালকোহল, ডিনেচার্ড স্পিরিট, এবসোলিউট অ্যালকোহল তৈরি হয়, যা থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, ভিনেগার, দেশি স্পিরিট ও ৯টি ব্র্যান্ডের ফরেন লিকার। শুধু ভিনেগার নয়, কেরুর তৈরি সব পণ্যের চাহিদাই খুব ভালো। আর এসব উপজাত পণ্য বিক্রি করেই কেরু লাভের মুখ দেখেছে, যেখানে দেশের অন্যান্য চিনিকলগুলো তাদের উপজাত ব্যবহার না করার কারণে ক্রমাগত লোকসান গুনছে।

লাভ করছে কেরু, দেশ জুড়ে বাড়ছে পরিধি :কেরু চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, কেরু কোম্পানি ঐতিহ্যবাহী একটি লাভজনক ও অপার সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান। এ অর্থবছরে কেরুর উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৬৭ কোটি টাকা। সরকারি কোষাগারে রাজস্ব দিয়েও ৯টি কৃষি খামার, চিনির লোকসান সমন্বয় করে ১০০ কোটি টাকা মুনাফা করা সম্ভব। আগের বছর ২০২১ সালে মুনাফা ছিল ৫০ কোটি ৭০ লাখ। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ে বিশেষ করে কেরুর উৎপাদিত হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিক্রিতে মুনাফা ছিল ২১ কোটি টাকা। তিনি বলেন, চলতি বছরে মিলের ৫৯৩ একর অলস জমি ছয় মাসের জন্য স্থানীয়দের মধ্যে লিজ দিয়ে ৯০ লাখ ৯০ হাজার এবং ৩৫০ একর আখের জমি লিজ দিয়ে ৮১ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হয়েছে।

Screenshot 2023-04-29 014440

কেরুর মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ইউসুফ আলী জানান, উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে কেরুর নিজস্ব ১৩টি ওয়্যারহাউজ ও তিনটি বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চলতি বছরে কুয়াকাটা ও কক্সবাজারে দুটি নতুন বিক্রয়কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে এবং রামু ও রাজশাহীতে দুটি বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কেরু চিনিকল আখচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি আব্দুল হান্নান ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বারি জানান, অল্প সময়ে হাইব্রিড জাতের আখ উৎপাদন ও আখ চাষ বৃদ্ধি করতে পারলে কেরুর বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতে পারে। পাশাপাশি চিনি ও আখের মূল্য বাড়াতে হবে এবং আখের সঙ্গে সাথি ফসল করা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

কেরুর কারখানায় চিটাগুড় থেকে তৈরি অ্যাবসলিউট অ্যালকোহল উড়োজাহাজ পরিষ্কার এবং বিজ্ঞানাগারে ব্যবহৃত হয়। রেকটিফায়েড থেকে হয় হোমিও-গ্রেন্ড স্পিরিট, যা হোমিও ওষুধের অন্যতম উপাদান। আর তৈরি করা হয় ডিনেচার্ড স্পিরিট। এটা আসবাবপত্রে বার্নিশের কাজে ব্যবহার করা হয়।

চিটাগুড় থেকে স্পিরিট তৈরির পর যে উচ্ছিষ্ট পানি থেকে যায়, তাকে বলে স্পেন্ট ওয়াশ। এর সঙ্গে প্রেসমাড বা আখের গাদ আর কিছু অণুজীব মিলিয়ে তৈরি করা হয় জৈবসার। আখের উপজাত থেকে দুই ধরনের ভিনেগারও উৎপাদন করে কেরু। মলটেড ভিনেগার ও সাদা ভিনেগার। মলটেড ভিনেগারে অন্য উপকরণের সঙ্গে চিটাগুড় ব্যবহৃত হয় সামান্য। তবে সাদা ভিনেগারে চিটাগুড় দেওয়া হয় না।

লিকার তৈরির জন্য এই মোলাসেসকে বিশাল বিশাল ট্যাংকে ভরা হয়। তাতে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ ইস্ট। ইস্ট মেশানোর পর মোলাসেসকে ৭২ ঘণ্টা ফারমেন্টেশনের জন্য রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ায় এতে অ্যালকোহল তৈরি হতে থাকে।  এরপর তাপ দিয়ে ভেপর বা বাষ্প তৈরি করা হয়। সেই বাষ্পকে ঠাণ্ডা করে তরলে রূপ দেওয়া হয়। এই তরলটাই পরিশুদ্ধ বা পিউরিফায়েড অ্যালকোহল। সেখান থেকে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কান্ট্রি স্পিরিট, রেকটিফায়েড স্পিরিট, এক্সট্রা নিউট্রাল অ্যালকোহল (ইএনএ), ডিনেচার্ড স্পিরিট, অ্যাবসলিউট অ্যালকোহল তৈরি হয়।

এক্সট্রা নিউট্রাল অ্যালকোহল উচ্চ মানসম্পন্ন। এ থেকেই তৈরি হয় কেরুর ইয়েলো লেভেল মলটেড হুইস্কি ও গোল্ড রিবন জিন। আর রেকটিফায়েড স্পিরিট থেকে তৈরি হয় ফাইন ব্র্যান্ডি, চেরি ব্র্যান্ডি, ইমপেরিয়াল হুইস্কি, অরেঞ্জ ক্রেকাউট আর জরিনা ভদকা। কেরুর রোজা রাম ও ওল্ড রাম তৈরি হয় কান্ট্রি স্পিরিট দিয়ে। এ ৯টি ব্র্যান্ড কেরুর ‘ফরেন লিকার’ হিসেবে পরিচিত। ১৮০, ৩৭৫ ও ৭৫০ মিলিলিটারের বোতলে এগুলো বাজারজাত করা হয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দর্শনায় কেরুর নিজস্ব দোকান থেকে লাইসেন্সধারীরা তা কিনতে পারেন। বছরে আনুমানিক ৩৯ লাখ ২০ হাজার বোতল (১ লাখ ৪০ হাজার কেইস) ফরেন লিকার উৎপাদন করে কেরু। আর বছর জুড়ে বাংলা লিকার উৎপাদন করা হয় ২৬ লাখ লিটার। সারা দেশের ১৩টি সেন্টার থেকে তা বিক্রি হয়।

এ প্রতিষ্ঠানের রসায়নবিদ আব্দুল হালিম জানান, ডিস্টিলারিতে অটোমেশনের কাজ সম্পন্ন হলে স্পিরিটজাত পণ্যের বিপণনে বৈচিত্র্য আসবে এবং বাজারে আরও চাহিদা বৃদ্ধি পাবে।

প্রয়োজন সংস্কার ও আধুনিকীকরণ :এটা ঠিক অন্য চিনিকলগুলোর তুলনায় কেরু লাভ করছে। তবে একে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকিয়ে রাখতে এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি কারখানার পুরোনো মেশিন বদলে আধুনিকীকরণও খুব জরুরি। এ প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক (কারখানা) রাজিবুল ইসলাম জানান, ৮৫ বছর বয়সী মিলটি  একটানা চলার ফলে কারখানার অধিকাংশ যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। পুরাতন মিলিং প্ল্যান্ট এবং ব্যাচ টাইপ সেন্ট্রিফিউগাল মেশিনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় চলছে। বয়লিং হাউজের চারটি এভাপরেটর, একটি প্যান ও একটি আরভিএফ স্থাপন করে ২০১৫/১৬ সালে মাড়াই চালু করা হয়েছিল। বিএমআর প্রকল্পের আওতায় টারবাইন ও বয়লার স্থাপনের কাজ চলমান। মিলিং প্ল্যান্ট স্থাপন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

কেরু শুরু যেভাবে :বাংলাদেশের শিল্প স্থাপনাগুলোর মধ্যে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লি. একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। চুয়াডাঙ্গা জেলাধীন সীমান্তবর্তী জনপদ দর্শনায় অবস্থিত চিনিকল, ডিস্টিলারি ও বাণিজ্যিক খামার সমন্বয়ে এটি একটি বৃহত শিল্প-কমপ্লেক্স। বাংলাদেশের এ অংশে ১৯৩৮ সালে যাত্রা শুরু করলেও ১৮০৫ সালে ইংরেজ ব্যবসায়ী জন ম্যাক্সওয়েল কর্তৃক ভারতের কানপুরে জাগমুতে ডিস্টিলারি স্থাপনের মধ্য দিয়ে কারখানাটির যাত্রা শুরু। ১৮৪৭ সালে রবার্ট রাসেল কেরু অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ঐ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩৮ সনে প্রাথমিকভাবে দৈনিক ১ হাজার টন আখ মাড়াই ও ১৮ হাজার প্রুফ লিটার স্পিরিট তৈরির লক্ষ্যে কেরুর আরও একটি শাখা তদানীন্তন নদীয়া জেলার অন্তর্গত এই দর্শনায় স্থাপন করা হয়। ১৯৬৫ সনের পাক-ভারত যুদ্ধের পর এটি শত্রু সম্পত্তিতে পরিণত হয়। ১৯৬৮ সনে কেরু অ্যান্ড কোং (পাকিস্তান) লিমিটেডের স্থলে এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ইপিআইডিসির ওপর ন্যস্ত করার সরকারি চেষ্টা সুপ্রিম কোর্টের রায়ে অকার্যকর হয়ে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি জাতীয়করণ হয় এবং তখন থেকে অদ্যাবধি এটি কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লি. নামে বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছে।